ফিরে দেখা রক্তাক্ত ৩১ জুলাই : কোটা সংস্কার আন্দোলন
কোটা সংস্কার আন্দোলন: ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এর দিনটিতে সহিংসতা, গ্রেপ্তার, প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
২০২৪ সালের ৩১ জুলাই (বুধবার) কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে হত্যা, হামলা, গুম, মামলা ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদে দেশব্যাপী ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এই কর্মসূচিতে অংশ নেয় বিপুল সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষার্থী।
ছাত্রদের কর্মসূচি ও পুলিশি বাধা
‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এর ডাক দেন আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আব্দুল কাদের, মঙ্গলবার রাতে টেলিগ্রাম অ্যাপে। বুধবার দুপুরে শিক্ষার্থীরা হাইকোর্টের মাজার গেট এলাকায় জড়ো হলে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। তিন ঘণ্টা ধরে সেখানে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুৎফর রহমানসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক। হাইকোর্টের ভেতরে আইনজীবীদের একটি দলও মিছিল করে।
একটি মিছিল দোয়েল চত্বর পর্যন্ত এগোলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে, পরে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় বিক্ষোভ ও গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি। সিলেটে, পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে মিছিল করলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় আন্দোলনকারীদের; এতে আহত হন অন্তত ২০ জন।
সহিংসতা ও গ্রেপ্তার
সারা দেশে এদিন পুলিশের লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস ও গ্রেনেড ব্যবহারে ছত্রভঙ্গ হয় অনেক মিছিল। গ্রেপ্তার করা হয় ১০০’র বেশি বিক্ষোভকারী, আহত হন অন্তত ৯০ জন, যাদের মধ্যে সাংবাদিকও ছিলেন।
পরদিনের কর্মসূচি: ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’
১ আগস্ট বৃহস্পতিবারের কর্মসূচি হিসেবে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক রিফাত রশিদের পাঠানো বিবৃতি অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে শহীদ ও আহতদের স্মরণ, তাদের পরিবার ও সহপাঠীদের স্মৃতিচারণ এবং চিত্রাঙ্কন, গ্রাফিতি, দেওয়াল লিখন, ডিজিটাল পোর্ট্রেট তৈরি করা হবে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
এই আন্দোলন ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও সম্পাদক শাহ মঞ্জুরুল হক আলাদাভাবে সংবাদ সম্মেলন করেন, যা অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক উদ্বেগ
- ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির আলোচনা স্থগিত করে।
- জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনার ফলকার তুর্ক শেখ হাসিনাকে চিঠি দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কারের ওপর জোর দেন এবং ভবিষ্যৎ নির্যাতন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন।
- মার্কিন সিনেটর বেন কার্ডিন ও কোরি বুকার বিবৃতি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগের নিন্দা জানান।
সরকারের পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া
- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আহতদের দেখতে যান কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে বৈঠকে তিনি দাবি করেন, "এটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, যা শ্রীলঙ্কার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকার পতনের উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে।"
- আন্দোলনের ১৫ দিনে গ্রেপ্তার হন ১০,৭৩৫ জন, এর মধ্যে শুধু ৩১ জুলাই দিনে গ্রেপ্তার হয় ৩৪১ জন, ঢাকায় মোট গ্রেপ্তার সংখ্যা দাঁড়ায় ২,৯৫০ জন।
- ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং নতুন দায়িত্ব পান আশরাফুজ্জামান।
- জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস ও প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করেন আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এবং দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগবে তা জানতে চান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সচল
১৪ দিন বন্ধ থাকার পর ৩১ জুলাই দুপুর ৩টার পর বাংলাদেশে ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুনরায় চালু হয়।

No comments
ধন্যবাদ।