ফিরে দেখা রক্তাক্ত ২৫ জুলাই : কোটা সংস্কার আন্দোলন
২৫ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সারাদেশে সহিংসতা ও গণগ্রেপ্তারের চিত্র
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ দিনে (১৭-২৫ জুলাই) সারা দেশে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়। পুলিশের তথ্যমতে, এ সময় অন্তত ৫ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ২,২০৯ জন, চট্টগ্রামে ৭৩৫ জন, বরিশালে ১০২ জন, নরসিংদীতে ১৫৩ জন এবং সিলেটে ১২৮ জন।
শুধুমাত্র ২৫ জুলাই বৃহস্পতিবারই ১২৮টি মামলায় ৪৫১ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ঢাকায় বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর ও সহিংসতার অভিযোগে মোট ২০১টি মামলা দায়ের হয়, যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ২,২০৯ জন গ্রেপ্তার।
(তথ্যসূত্র: দৈনিক ইনকিলাব, ২৬ জুলাই)
আন্দোলনের পটভূমি ও বিস্তার
১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের পর ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। পরদিন থেকে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও প্রাণহানির ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সারাদেশ।
আন্দোলন ঘিরে নতুন করে পাঁচটি মামলায়ও শিক্ষার্থীদের আসামি করা হয়েছে। আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম এসব মামলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষায়, “শিক্ষার্থীদের দমন করতেই এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে।”
২৫ জুলাইয়ের পরিস্থিতি
চলমান অস্থিরতার মধ্যেও ওইদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চার ঘণ্টার জন্য খুলে দেওয়া হয় সরকারি ও বেসরকারি অফিস। রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কারফিউ শিথিলের সময় লঞ্চ চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ে জননিরাপত্তার কথা বলে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
আন্দোলনের নতুন ঘোষণা
২৫ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, আন্দোলন এখন আর শুধুমাত্র কোটা সংস্কার নয়—এটি পরিণত হয়েছে ‘ছাত্র-নাগরিক অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে’। তিনি গুম-খুনের বিচার, মামলা প্রত্যাহার, নিরপরাধদের মুক্তি, ক্ষতিপূরণ এবং ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী রাজনীতি বন্ধের দাবিতে দফাভিত্তিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
‘সাধারণ শিক্ষার্থী মঞ্চ’ও একইদিন একটি বিবৃতি দেয়, যেখানে বলা হয় ২৩ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপন আংশিক বিজয় হলেও দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
প্রাণহানি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
২৫ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হওয়ায় কোটা আন্দোলন ঘিরে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৩ জনে (তথ্যসূত্র: দৈনিক সমকাল, ২৬ জুলাই)। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে পুলিশের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ তোলে।
সকালে মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শনে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আমি জনগণের কাছে বিচার চাই।”
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নিহতদের পরিবার ও আহতদের চিকিৎসার দায় রাষ্ট্র নেবে বলে ঘোষণা দেন।
এদিন ঢামেক মর্গ থেকে ৮৫টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি ৮টি অজ্ঞাত লাশ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে দেওয়া হয়।
কারফিউ, সেনা টহল ও নজরদারি
পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হওয়ায় কারফিউর সময়সীমা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীতে কারফিউ বহাল থাকে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সেনা টহল ছিল কঠোর। মোড়ে মোড়ে বসানো হয় চেকপোস্ট, চলতে থাকে তল্লাশি ও টহল।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক আন্দোলন দমনে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশ সরকার যেন বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে এবং সব কার্যক্রম মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয়।”
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানান, সহিংসতার ঘটনায় “স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত জরুরি।”
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, “বাংলাদেশের পরিস্থিতি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা চাই শান্তি ফিরে আসুক।”
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ঢাকায় নিযুক্ত তাদের ‘জরুরি নয়’ এমন কর্মী ও পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশ ছাড়ার অনুমতি দেয়।
শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব
এইচএসসি পরীক্ষার ২৮, ২৯, ৩১ জুলাই ও ১ আগস্টের তারিখগুলো স্থগিত করা হয়। এর আগে ১৮, ২১, ২৩ ও ২৫ জুলাইয়ের পরীক্ষাও স্থগিত হয়েছিল।
আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বার্তা ও কর্মসূচি
২৫ জুলাই আট দফা নির্দেশনা দেয় আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে রয়েছে আহতদের তালিকা তৈরি, হাসপাতালে সহায়তা, নিহতদের পরিবারকে সহানুভূতি জানানো, সন্ত্রাসী ছাত্র রাজনীতির অবসান ইত্যাদি।
র্যাব ও আইনি অবস্থান
র্যাব এক বিবৃতিতে জানায়, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো হয়নি। শুধুমাত্র কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত না করে নির্বিচারে গ্রেপ্তার দুঃখজনক।
সরকারপ্রধানের বার্তা ও প্রতিশ্রুতি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে আশ্বস্ত করে বলেন, “সরকার আইনের শাসনে বিশ্বাসী। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
২০২৪ সালের ২৫ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ব্যাপক সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও গণগ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। ১৭ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত নয় দিনে সারা দেশে অন্তত ৫ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ২,২০৯ জন, চট্টগ্রামে ৭৩৫ জন, বরিশালে ১০২ জন, নরসিংদীতে ১৫৩ জন এবং সিলেটে ১২৮ জন।

No comments
ধন্যবাদ।