“আমার ভাই আর নেই... এই সত্যটা আজও আমি মেনে নিতে পারি না”
“আমার ভাই আর নেই... এই সত্যটা আজও আমি মেনে নিতে পারি না”
— জেসিকা জামান, শহীদ জাহিদুজ্জামান তানভীনের বোন
১৮ জুলাই ২০২৪, ইউএস সময় সকাল ৭টা ৩০ মিনিট। ঘুম ভাঙতেই পেলাম হৃদয়বিদারক এক সংবাদ—আমার ভাই, এই পৃথিবীতে আমার একমাত্র সহোদর, আর নেই।
ফেসবুকে ঢুকেই চোখে পড়ে একটি ভিডিও—আমার মা কাঁদছেন, আহাজারি করছেন ভাইয়ের রক্তাক্ত নিথর দেহের পাশে। মুহূর্তেই যেন সবকিছু থমকে গেল। বদলে গেল আমার বিশ্বাস, চিন্তাধারা, জীবনবোধ—সবকিছু।
যখন আমি খবরটা পেলাম, তখন ভাইয়ের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আল্লাহ আমাদের সেই কষ্টও দিয়েছিলেন—জানাজা চাইবার সুযোগ পর্যন্ত পাইনি।
দেশে তখন ইন্টারনেট এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন। জানতেই পারিনি কী ঘটেছে, বাবা-মা কেমন আছে, কীভাবে সামলাচ্ছে এই বিপর্যয়। শুধু বারবার মনে হচ্ছিল—যখন আমার পরিবার এক ভয়াবহ নিসংসতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, আমি তখন গভীর ঘুমে!
পরে জানতে পারি, শুধু ১৮ জুলাই নয়, আগের দুদিনও সে আন্দোলনে গিয়েছিল। অথচ সে তো সরকারি চাকরি তো দূরের কথা, কোনো চাকরিই করতে চাইত না!
ছবিতে যে ভাঙাচোরা এম্বুলেন্সটি দেখছেন, সেটিই ভাইয়ের মরদেহ আনার একমাত্র উপায় ছিল। ওই সময় এমনকি চালকও পাওয়া যাচ্ছিল না। খালামনিরা যখন হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন, তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না। পুলিশকে অনুনয় করে, লাঠির আঘাত সহ্য করে তারা শেষমেশ হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
সেই হাসপাতাল যেন মৃত্যুপুরীতে রূপ নিয়েছিল। তবু আল্লাহর অশেষ রহমত যে, আমরা অন্তত ভাইকে সেখান থেকে বের করে এনে ঠিকমতো দাফন করতে পেরেছি। এখন মন চাইলে বাবা-মা সন্তানের কবরের পাশে গিয়ে বসতে পারে, কথা বলতে পারে।
কিন্তু যারা গণকবরে ঘুমিয়ে আছে, তাদের পরিবারগুলো কেমন আছে? কোথায় গিয়ে তারা খুঁজে পায় একটু সান্ত্বনা? একটা বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো অনেকে খুঁজে পায়নি প্রিয় সন্তানের দেহাবশেষ।
তারা কেবল পরিসংখ্যান নয়—They are not just statistics.
এক বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়ে আজ চারপাশে চলছে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার প্রতিযোগিতা। কিন্তু যারা এই হিংস্র আদেশ দিয়েছিল, যারা নিষ্পাপ তরুণদের রক্তে মাটি রাঙিয়েছে, তাদের জন্য মনে শুধু একটাই কথা আসে—ধ্বংস হোক তাদের দুই হাত, ধ্বংস হোক তারা নিজেরাই।
তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিরা যেন তাদের কোনো উপকারে না আসে, বরং তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে ওঠে। তাদের ওপর নেমে আসুক আগুনের শাস্তি, দগ্ধ হোক তারা আল্লাহর লেলিহান আজাবে।
আমার ছোট্ট সোনামনি ভাইয়া, তুমি যে ইমান নিয়ে চিন্তিত ছিলে, সেই ইমানই তোমাকে পৌঁছে দিয়েছে পরম সাফল্যে—এই দুনিয়া ও আখিরাতে, ইনশাআল্লাহ। তুমি আছো আমাদের প্রতিটি দোয়া ও অশ্রুজলের ভেতর।

No comments
ধন্যবাদ।