ফিরে দেখা রক্তাক্ত ২১ জুলাই : কোটা সংস্কার আন্দোলন
কোটা সংস্কার আন্দোলন: রক্তাক্ত সংঘর্ষ, আদালতের নির্দেশনা ও সরকারের অবস্থান
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুলাই, যা প্রথমে ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে ১৫ জুলাই থেকে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ অন্তত ছয়জন নিহত হন। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে (২০ জুলাই পর্যন্ত) সংঘর্ষে প্রাণহানি দেড় শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।
আদালতের হস্তক্ষেপ
চরম সহিংসতা ও দেশজুড়ে কারফিউ জারির মধ্যেই ২১ জুলাই এক যুগান্তকারী রায় দেয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে বলা হয়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে, বাকি ৭ শতাংশ কোটা নির্ধারিত থাকবে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা থাকবে।
তবে রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সেই পদ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। প্রয়োজনে সরকার আদালতের নির্দেশনা সংশোধন, সংস্কার বা বাতিলের ক্ষমতা রাখে। একসঙ্গে গেজেট জারির নির্দেশও দেয় আদালত।
রায় পরবর্তী পরিস্থিতি
রায়ের দিনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছিল সহিংসতা ও বিক্ষোভ। কারফিউ চলমান থাকা সত্ত্বেও ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে নিহত হন অন্তত ১৯ জন। শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই মৃত অবস্থায় আনা হয় ১০ জনকে।
নরসিংদীতে সংঘর্ষে নিহত হন চারজন। রাজধানীর কুড়িল, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা ও মিরপুরে সংঘর্ষে আহত হন শতাধিক। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। সিদ্ধিরগঞ্জে ১৯টি যানবাহনে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠে।
আন্দোলনকারীদের প্রতিক্রিয়া ও কর্মসূচি
রায়ের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগের রায়কে ইতিবাচক বলা হলেও তাঁরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন সরকারের নির্বাহী আদেশকে। শাটডাউন কর্মসূচি সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও চার দফা দাবি পূরণে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল:
১. কারফিউ প্রত্যাহার
২. ইন্টারনেট চালু
৩. বিশ্ববিদ্যালয় ও হল খুলে দেওয়া
৪. আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
এছাড়া আট দফা দাবির ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ২২ জুলাই গায়েবানা জানাজার কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। তবে আন্দোলনরত আরেকটি অংশ শাটডাউন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় এবং সংসদে আইন পাসের দাবিতে এক সপ্তাহের আল্টিমেটাম দেয়।
সরকারি প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে। ২১ জুলাই দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়।
এদিন রাতে গণভবনে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে তিন বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও নিরাপত্তা উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন।
কূটনীতিকদের ব্রিফিং ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ছিনিয়ে নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির। ব্রিফিংয়ে সহিংসতার একটি ভিডিও ক্লিপ দেখিয়ে আন্দোলনকে স্বাধীনতাবিরোধী ও উগ্রপন্থীদের ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়।
গ্রেফতার ও বিচারিক প্রক্রিয়া
রামপুরা ও অন্যান্য এলাকায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার অভিযোগে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নিপুণ রায় ও গণ-অধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।
কোটা বাতিলের রায় স্থগিত, পুনরায় চালু হলো কোটা পদ্ধতি—সারাদেশে সহিংসতায় নিহত অন্তত ১৯
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ২১ জুলাই (রবিবার) হাইকোর্টের কোটা বাতিলের রায় খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেন। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৭ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল রেখে ৯৩ শতাংশ পদে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে সরকারকে অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা নির্ধারিত থাকবে। তবে প্রয়োজনে সরকার এই কোটাব্যবস্থায় সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে।
রায়ের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে একে স্বাগত জানানো হয় এবং চলমান শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীরা ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে চার দফা দাবি তোলে—কারফিউ প্রত্যাহার, ইন্টারনেট চালু, বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হল খুলে দেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সহিংসতায় প্রাণহানি, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ
একই দিনে চলমান কারফিউ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। ঢাকাসহ অন্তত ছয় জেলায় সংঘর্ষে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১০ জন মারা যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ৪ জন নরসিংদীতে, ২ জন গাজীপুরে এবং নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও চট্টগ্রামে একজন করে নিহত হন। শতাধিক মানুষ আহত হন, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষুব্ধ জনতা ১৯টি যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাজধানীর বাড্ডা, কুড়িল, যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরে দিনভর বিক্ষোভ-সংঘর্ষ চলে।
নৃশংস দমন-পীড়নের মধ্যেই ২০২৪ সালের ২১ জুলাই কোটা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ওই রায়ে বলা হয়, সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ এবং কোটা ভিত্তিতে ৭ শতাংশ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এই রায়ের আলোকে সরকারকে অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এই রায়ের আগেই দেশজুড়ে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল পরিস্থিতি। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে কারফিউ জারি করে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ১৭৭ জন নিহত হন সেদিন। ২০ জুলাই নিহত হন আরও ৬৫ জন। এ অবস্থায় আন্দোলনের ধারা আর কেবল কোটা সংস্কারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি রূপ নেয় গণবিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে।
বিক্ষোভ দমন করতে সরকারের হাতে ছিল সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কিন্তু তাতেও থামানো যায়নি ছাত্র-জনতার ক্ষোভ। স্লোগান উঠে—“তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইরে ফিরায়ে দে।” আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে তখন আর চাকরির কোটা নয়, বরং গুলি ও গুমের বিচার এবং নিপীড়নের অবসান ছিল প্রধান দাবি।
২১ জুলাই আদালতের রায় ঘোষণার দিনও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলতে থাকে গুলি ও দমনপীড়ন। ঢাকার পূর্বাচলে সেদিন ভোরে রাস্তার পাশে ফেলে যাওয়া হয় ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামকে। তাঁকে ১৯ জুলাই গভীর রাতে খিলগাঁওয়ের বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন।
আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য আকরাম হুসাইন বলেন, “১৬ থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত গণহত্যা চালিয়েও আন্দোলন থামাতে পারেনি শেখ হাসিনা। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে শুধু ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে নয়, বরং স্বৈরাচার পতনের লক্ষ্যে।”
তিনি বলেন, “২১ জুলাই আদালতের রায় যেন ছিল সরকারের শেষ অস্ত্র। কিন্তু রক্তাক্ত রাজপথে তখন জনগণের রায়ই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
এই প্রেক্ষাপটে কোটা সংস্কারের রায় আন্দোলনের দাবির সামান্য একটি অংশে পরিণত হয়। মূল দাবি হয়ে দাঁড়ায় শহীদদের রক্তের হিসাব, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পদক্ষেপ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘দেখামাত্র গুলি’ করার মৌখিক নির্দেশ দেয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। একইসঙ্গে সারাদেশে ৫৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ২০০ জন ঢাকায়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলামকে ১৯ জুলাই রাতে খিলগাঁও এলাকা থেকে ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে’ তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ২১ জুলাই ভোরে পূর্বাচল থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
২১ জুলাই রাত ৮টা ও ২২ জুলাই সকালে গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বাসভবনে দু'বার হামলা চালানো হয়। এতে বাড়ির একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পিএসসির পরীক্ষা স্থগিত, জানাজা আহ্বান
এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) জানায়, ৩১ জুলাই পর্যন্ত সব নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে ২২ জুলাই গায়েবানা জানাজার ডাক দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণসহ আট দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জরুরি বৈঠক
২১ জুলাই রাতে গণভবনে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

No comments
ধন্যবাদ।