ঐতিহাসিক জুলাই : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস
২০২৪ সালের ১ জুলাই: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসগড়া সূচনা
২০২৪ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ একটি যুগান্তকারী ঘটনার সাক্ষী হয়। সেদিন শিক্ষার্থীদের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ পরিণত হয় বৃহৎ ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’। প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে এটি ছিল শিক্ষার্থীদের প্রথম সুসংগঠিত গণআন্দোলন, যা পরবর্তীকালে সরকারের পতনের পথ তৈরি করে দেয়।
আন্দোলনের পটভূমি
আন্দোলনের সূচনা ঘটে হাইকোর্টের এক রায়ের পর, যেখানে ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের সরকারি প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। সেই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন রায়ে ৫৬ শতাংশ কোটা ফের কার্যকর হয়—মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০%, নারীদের জন্য ১০%, পশ্চাৎপদ জেলার জন্য ১০%, সংখ্যালঘুদের জন্য ৫% এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১%। শিক্ষার্থীদের দাবি, এই কোটা পদ্ধতি মেধার বিরুদ্ধে স্পষ্ট বৈষম্য তৈরি করে।
প্রথম প্রতিক্রিয়া ও সংগঠনের সূচনা
৫ জুন হাইকোর্টের রায় প্রকাশিত হতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার বই ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ তে লিখেছেন, “সেদিন স্কুটি মেরামত করাতে গিয়েছিলাম, হঠাৎ ফেসবুকে রায়ের খবর দেখে মনে হলো ২০১৮ সালের অর্জন ধ্বংস হয়ে গেল।”
তৎক্ষণাৎ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে বৈঠকে আন্দোলনের প্রাথমিক রূপরেখা ঠিক হয় এবং সন্ধ্যা ৭:৩০টায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী’ ব্যানারে প্রথম মিছিল বের হয়। ৬ জুন রাজু ভাস্কর্যে ডাকা হয় কেন্দ্রীয় সমাবেশ, যেখানে চার দফা দাবির ভিত্তি স্থাপন হয়।
আন্দোলনের বিস্তার ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতা
-
৫-৯ জুন: ঢাবি, জাবি, রাবি, চবি, জগন্নাথসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
-
১০ জুন: সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দিয়ে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়—প্রজ্ঞাপন পুনর্বহাল না হলে লাগাতার কর্মসূচি।
১ জুলাই: আন্দোলনের নতুন অধ্যায়
সরকার কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় ১ জুলাই ঢাবিতে কেন্দ্রীয় মিছিল এবং জাহাঙ্গীরনগরে মহাসড়ক অবরোধের মাধ্যমে আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে পরিচিত এ আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবিতে লাগাতার কর্মসূচি শুরু করে।
‘বাংলা ব্লকেড’ ও পুলিশের সহিংসতা
১-৬ জুলাই: বিক্ষোভ, মানববন্ধন, অবরোধ
৭ জুলাই: ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে দেশব্যাপী অবরোধ শুরু—ঢাকায় গণপরিবহন বন্ধ, কেবল মেট্রোরেল চালু থাকে
শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার মুখে পড়ে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
- ১৪ জুলাই: রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান
- একই দিন শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বংশধর’ আখ্যা দেন
- প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান:
- “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার!”
- “চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার”
বিভাজন, গুম, ও শাটডাউন
- ১৮-১৯ জুলাই: ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ পালিত হয়
- ১৯ জুলাই: আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম আটক
- একই সময়ে তিনজন প্রতিনিধির পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও আট দফা উত্থাপন—যা নিয়ে আন্দোলনের অন্যান্য নেতা ও ক্যাম্পাসে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে
- ২১-২২ জুলাই: একাংশ ‘৯ দফা’ দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও, নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবি দিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামসহ আন্দোলন স্থগিত করেন
গুম, গ্রেপ্তার ও পুলিশের ভূমিকা
-
২৪ জুলাই: নিখোঁজ থাকা তিন সমন্বয়ক উদ্ধার
-
২৬ জুলাই: নাহিদ ইসলামসহ তিনজনকে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়া হয়
-
২৭ জুলাই: আরও দুই সমন্বয়ক গোয়েন্দা হেফাজতে
চাপে আন্দোলন প্রত্যাহার ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া
- ২৮ জুলাই: পুলিশের হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন
- শিক্ষার্থীদের বৃহৎ অংশ দাবি করে, “এই ঘোষণা চাপে ও জোরে আদায় করা হয়েছে, এবং এটি আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে না”
- আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়
‘ন্যায়বিচারের জন্য পদযাত্রা’ ও পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা
- ৩১ জুলাই: ‘মার্চ ফর জাস্টিস’—গুম, হত্যা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে পদযাত্রা
- ১ আগস্ট: হেফাজত থেকে মুক্তি পায় ছয় সমন্বয়ক
-
২ আগস্ট: গণমিছিল ও প্রার্থনার কর্মসূচি পালন
- মুক্তিপ্রাপ্ত সমন্বয়কেরা জানান, পুলিশের হেফাজতে দেওয়া ভিডিও বিবৃতি স্বেচ্ছায় ছিল না
২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুধু একটি কোটার প্রতিবাদ ছিল না—এটি ছিল স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের এক ঐতিহাসিক প্রত্যাখ্যান। ছাত্রদের আত্মত্যাগ, বিভাজন, প্রতিরোধ এবং পুনঃসংগঠনের মধ্য দিয়ে এটি রূপ নেয় একটি জাতীয় প্রতিবাদের রূপে—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

No comments
ধন্যবাদ।