ফিরে দেখা রক্তাক্ত ২৮ জুলাই : কোটা সংস্কার আন্দোলন
জুলাইয়ের শেষ দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গণগ্রেপ্তার ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলার মুখে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। তবে থেমে থাকেননি তাঁরা। গোপনে একে-অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নতুন পথ খুঁজে নেন। মিছিল-সমাবেশের পরিবর্তে প্রতিবাদের শক্তিশালী নতুন মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতিকে।
২৭ জুলাই বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফেনীর তাকিয়া রোড সংলগ্ন পানির ট্যাঙ্কি রোডে ১০-১২ জন শিক্ষার্থী একত্র হয়ে শুরু করেন দেয়ালচিত্র আঁকা। প্রভা, দিবা, স্নেহা, ফারহা, তুবা, সাবা, নুহানা, মানিক, আজিম, সাগর, রাজমান, সোহেল ও নাঈম এই গ্রাফিতি কর্মসূচিতে অংশ নেন।
প্রথমবারের মতো দেয়ালে ফুটে ওঠে প্রতিবাদের বার্তা—‘শিক্ষা-ছাত্রলীগ, একসঙ্গে চলে না’। রং-তুলির প্রতিবাদে শহরের অলিগলি একেকটি দেয়াল রূপ নেয় জনতার ক্যানভাসে। প্রতিবাদের এই ভাষা নতুন মাত্রা যোগ করে আন্দোলনে। সরকার পতনের ইতিহাস এবং তারুণ্যের প্রত্যয় প্রতিফলিত হতে থাকে দেয়ালচিত্রে।
ফেনী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ, শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক, ডাক্তারপাড়া, কলেজ রোড, মাস্টারপাড়া, মিজান রোড, রাজাঝির দিঘির পাড়, মুক্তবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার দেয়াল জুড়ে শোভা পায় এসব রঙিন প্রতিবাদচিত্র। এমনকি উপজেলা পর্যায়েও দেখা যায় তারুণ্যের রঙে আঁকা দেয়ালে ফুটে উঠেছে গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদের প্রতিরোধী ছবিটি।
দেয়ালচিত্রগুলোতে উঠে আসে নানা স্লোগান ও প্রতীকী বার্তা—‘৩৬ শে জুলাই’, ‘বিকল্প কে? আমি, তুমি, আমরা’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’, ‘স্বাধীনতা এনেছি, সংস্কারও আনবো’, ‘ভয়ের দেওয়াল ভাঙলো, এবার জোয়ার এলো ছাত্র-জনতার’, ‘রক্তাক্ত জুলাই ২০২৪’—এসবই ছিল প্রতিবাদের ক্যানভাসে আঁকা নতুন আশার ছবি।
ফেনী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রহমত আলী মানিক সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, “২৭ জুলাই রাতে আমরা ১০-১২ জন গ্রাফিতি আঁকতে যাই। ছাত্রদল নেতা মোরশেদ আলম মিলন স্প্রে রং কেনার জন্য ১ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। আঁকা শেষে আমাদের প্রতিবাদী চেতনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফেসবুক ও গণমাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ছাত্রলীগ-যুবলীগ আমাদের খুঁজতে থাকে। তবে এরপর আন্দোলন শুধু বাড়তেই থাকে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের মধ্য দিয়ে সেই দেয়ালচিত্র শহরের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।”
অন্যদিকে স্নেহার মা বলেন, “আমি জানতাম ঝুঁকি আছে, তবুও মেয়েকে যেতে দিয়েছিলাম। কারণ, এই দেশ আমাদের। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো আসেনি, তবে আমি বিশ্বাস করি, ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ একদিন বৈষম্যমুক্ত হবেই।”

No comments
ধন্যবাদ।