Header Ads

Header ADS

মায়াবী শহর মিরিসা

মায়াবী শহর মিরিসা

ভ্রমণ কি কেবলই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছানো? আমার কাছে কখনো কখনো এটি নিজেকে আবিষ্কারের এক নীরব যাত্রা—যার গন্তব্য মানচিত্রে না থাকলেও হৃদয়ে গেঁথে থাকে গভীর ছাপ। এমনই এক মায়াবী অভিজ্ঞতা হয়েছিল শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত ছোট্ট শহর মিরিসাতে। এখানে সূর্য ডোবে ধীরে, যেন ক্লান্ত কোনো কবির শেষ শব্দগুলো থেমে যায় কাগজের কোণে।

মিরিসা এক নয়নাভিরাম সৈকত শহর, যাকে পাখির চোখে দেখলে মনে হয় চাঁদের ফালি। ভারত মহাসাগরের কোলে অবস্থিত এই সৈকতজুড়ে নরম বালু, শান্ত ঢেউ আর সারি সারি নারকেলগাছ। যারা নিরিবিলি পরিবেশ, ফটোজেনিক সৈকত আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভালোবাসেন, তাদের জন্য মিরিসা এক আদর্শ গন্তব্য।

আমার ১০ দিনের শ্রীলঙ্কা সফরে দুই দিন ছিল মিরিসায়। গল বাসস্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাসে ঘণ্টাখানেকের পথ। শ্রীলঙ্কার স্থানীয় বাস অভিজ্ঞতাটাই আলাদা—রঙিন বাহনের গায়ে ধর্মীয় চিত্র, ভেতরে উচ্চ শব্দে চলা সিংহলি পপ বা হিন্দি গান। মাত্র ১২০ রুপিতে এই চলন্ত ‘রোলার কোস্টারে’ চড়ে সমুদ্রপাড়ি দিয়ে মিরিসায় পৌঁছানো নিজেই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

আমার থাকার জায়গা ছিল সমুদ্রঘেঁষা হোটেল ‘টুয়েন্টি-টু সুইস রেসিডেন্স’। হোটেলের লাগোয়া সৈকতে সাঁতার, সার্ফিং ও সূর্যস্নানের জন্য নিরাপদ পরিবেশ। তবে সূর্যাস্ত দেখার আদর্শ স্থান হলো মিরিসার বিখ্যাত কোকোনাট ট্রি হিল

টুকটুকে চড়ে হোটেল থেকে ১৫ মিনিটেই পৌঁছানো যায় হিলের পাদদেশে। পথঘাটটা কখনো বালুর, কখনো ঘাসে ঢাকা, কখনো কাঁকর-পাথরে ভরা। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চোখের সামনে মেলে ধরে অসীম নীল সমুদ্র। লালচে পাহাড় আর নীল জলরাশির সেই কনট্রাস্ট যেন রঙের ছটায় আঁকা কোনো পোস্টকার্ড। সূর্যাস্তের মুহূর্তগুলো এখানে সময়কে থমকে দেয়। আকাশে রঙের খেলা—লাল, কমলা আর গোলাপি—তাকে ফ্রেমবন্দী না করে উপায় নেই।

কোকোনাট ট্রি হিলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি মিরিসার আরেক পরিচয় তার তিমি দর্শন। স্থানীয় নৌকায় চড়ে দেখা যায় নীল তিমি আর ডলফিনের নৃত্য। এ ছাড়া আছে সার্ফিং ও স্কুবা ডাইভিংয়ের সুযোগ। শুরুর পর্যায়ের জন্য বেশ কিছু সার্ফিং ক্লাবও রয়েছে এখানে।

এখানে এসে যেটা না করলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়, সেটা হলো স্টিল্ট ফিশিং—একেবারে ব্যতিক্রমী মাছ ধরার পদ্ধতি, যেখানে জেলেরা কাঠের খুঁটির ওপর বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমুদ্রে মাছ ধরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য আজ পর্যটকদের জন্য এক দর্শনীয় অভিজ্ঞতা।

সন্ধ্যার পর মিরিসার সৈকত এক অন্যরকম প্রাণ পায়। কাঠের টেবিল, মোমবাতির আলো, গিটারের সুর আর সি-ফুডের গন্ধে ভরে ওঠে পরিবেশ। বিচসাইড ক্যাফে ও রেস্টুরেন্টে নারকেলের দুধে রান্না করা কারি, টাটকা গ্রিলড সি-ফুড আর রঙিন ফলের জুসে খুঁজে পাওয়া যায় স্থানীয় জীবনের স্বাদ। আমি সে রাতে খেয়েছিলাম ক্র্যাব কারি আর ডেজার্টে ওয়াটালাপ্পাম—নারকেলের দুধে তৈরি শ্রীলঙ্কার এক ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন। স্বাদ এখনো স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

প্রতিটি জায়গার থাকে নিজস্ব ভাষা, অনুভবের ছাপ। মিরিসার সেই ভাষা প্রকৃতির নির্মলতা। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, জাঁকজমকের বাহুল্য ছাড়া, এখানে অনুভব করা যায় প্রকৃতির নিঃশব্দ ডাক। আর সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার ঠিকানা হতে পারে কোকোনাট ট্রি হিল—যেখানে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তে ধরা দেয় জীবন আর প্রকৃতির নিগূঢ় সংলাপ। 

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.