চরম বিঘ্ন পণ্য রফতানিতে
দেশে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিদেশে পণ্য রফতানি কার্যক্রমে চরম বিঘ্ন ঘটছে। সময়মতো জাহাজে করে পণ্য রফতানি করতে না পারায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে চার-পাঁচগুণ বেশি খরচে বিমানে করে পণ্য রফতানি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে চরম লোকসানে পড়তে হচ্ছে রফতানিকারকদের।শিল্পোদ্যোক্তা ও রফতানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, বিমানে পণ্য পরিবহনের চাপ, দেড় লাখ ডলারের পণ্য পাঠাতে ভাড়া ৭৫ হাজার ডলার। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এমবি নিট ফ্যাশনস ইতালীয় ক্রেতার জন্য ৫৮ হাজার ৮৯৩টি জ্যাকেট, টি-শার্ট ও জগার বানিয়েছে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি এসব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ইতালি পাঠানোর কথা ছিল; কিন্তু চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কোম্পানিটি পণ্য পাঠাতে পারেনি।
এদিকে ইতালীয় ক্রেতা বারবার পণ্য পাঠানোর তাগিদ দিচ্ছেন। তারা এই সপ্তাহের মধ্যেই মাল পৌঁছানোর সময়ও বেঁধে দিয়েছেন। তাই অনেকটা নিরুপায় হয়ে এমবি নিট ফ্যাশনসের মালিক আকাশপথে পণ্য পাঠানোর উদ্যোগ নেন। এক সপ্তাহ অনেক ঘোরাঘুরি করে অবশেষে গত বৃহস্পতিবার একটি বিদেশি এয়ারলাইন্স বা উড়োজাহাজ সংস্থায় ওই পণ্য পাঠানোর বুকিং দেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই পোশাকের চালান ইতালির উদ্দেশে রওনা দেয়নি। চার দিন অপেক্ষার পর গতকাল রোববার সেই পণ্যের চালান ঢাকা থেকে উড়াল দেয়, আর ইতালি গিয়ে পৌঁছাবে আগামী বুধবার।
এবার জানা যাক ওই পণ্য পাঠাতে কত খরচ হলো। খরচ শুনলে আপনার চোখ চড়কগাছ হয়ে যাবে। ১ লাখ ৫১ হাজার ডলারের পোশাক পাঠাতে এমবি নিট ফ্যাশনসের খরচ হচ্ছে ৭৫ হাজার ৩৩৫ ডলার; অর্থাৎ পণ্যের ভাড়া মেটাতেই যাচ্ছে দামের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ অর্থ। চালানটিতে ১৬ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের ১ হাজার ১৮৪টি কার্টন পাঠানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও নিট পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘চলমান অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে রাস্তাঘাটে ঝামেলা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে মালামাল পাঠাতেই পারিনি। এদিকে বিদেশি ক্রেতার চাপ তো আছে। তাই বাধ্য হয়েই আকাশপথে পণ্য পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এই চালানে আমাদের লোকসান হলো। শুধু ক্রেতা ধরে রাখার জন্য আমরা লোকসান দিয়ে মালামাল পাঠিয়েছি।’
শুধু এমবি নিট ফ্যাশনসই নয়, এ রকম শত শত পোশাক শিল্পের প্রতিষ্ঠানের মালিক এখন এমন ঝামেলায় পড়েছেন। অনেকেই ক্রেতা ধরে রাখতে সমুদ্রপথের পরিবর্তে লোকসান মেনে বাড়তি অর্থ গুণে বিমানযোগে মালামাল পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। দিকে কার্গো তথা উড়োজাহাজে করে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে বলে রফতানিকারকরা জানান।
উত্তরার ভারটেক্স সোর্সিং বিডি নামের একটি বায়িং হাউস জানায়, তারা কয়েক দিন আগে বেলজিয়াম এবং অস্ট্রিয়ায় টি-শার্ট ও স্কার্ফ পাঠিয়েছে। কাতার এয়ারওয়েজে প্রতি কেজি পণ্য পাঠাতে তাদের সাড়ে ছয় ডলার খরচ পড়েছে।
পাঁচ-ছয় মাস আগেও প্রতি কেজি মাল পাঠাতে সাড়ে তিন থেকে চার ডলার খরচ পড়ত বলে মন্তব্য করেন ভারটেক্স সোর্সিংয়ের কর্ণধার চৌধুরী আরিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘এখন একটি কারখানায় জ্যাকেট বানানো হচ্ছে। দেশের বর্তমান অবস্থায় সঠিক সময়ে পণ্যের চালান ক্রেতার কাছে পাঠাতে পারব কি না সন্দেহ আছে।’
আকাশপথে তৈরি পোশাক, তাঁতপণ্য, চামড়াজাত দ্রব্য, জুতা, পাটজাত বিভিন্ন পণ্য, ওষুধ ও শাকসবজি বেশি রফতানি হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগ পোশাকের চালান।
গত কয়েক মাসে উড়োজাহাজে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আবার বাড়তি ভাড়া গুণেও সময়মতো গন্তব্যে পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। কারণ, এয়ার কার্গো, তথা পণ্যবাহী উড়োজাহাজের অভাব আছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে ঢাকা থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে এক কেজি পণ্য পাঠাতে বিমান ভাড়া লাগত আড়াই থেকে তিন মার্কিন ডলার। এখন তা বেড়ে ছয় ডলার পর্যন্ত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় যেখানে কেজিপ্রতি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ডলারেই মালামাল পাঠানো যেত, সেখানে এখন লাগে সাড়ে সাত ডলার।
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোই আকাশপথে বেশি পণ্য পরিবহন করে। কিন্তু দেশে ডলার সংকটের কারণে বিমান সংস্থাগুলো নিজেদের মূল প্রতিষ্ঠানে অর্থ নিতে পারছে না। এতে প্রায় ৩৩ কোটি ডলারের মতো এ দেশে আটকে গেছে।
নিজেদের মূল সংস্থায় অর্থ নিতে না পারায় ঢাকা থেকে অনেক বিমান সংস্থা কার্গো ফ্লাইট বা পণ্য পরিবহন কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, আগে কুয়েত এয়ারওয়েজ সপ্তাহে সাত-আটটি ফ্লাইটে পণ্য নিত। এখন তা দুটিতে নেমেছে। ফ্লাই দুবাই তাদের ফ্লাইট কমিয়ে অর্ধেক করেছে। এ ছাড়া কাতার এয়ারওয়েজ, টার্কিশ এয়ারলাইন্স ও সেভেনএল নামে তিনটি বিমান সংস্থা সপ্তাহে এক-দুটি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে।
আকাশপথে পণ্য পরিবহনের চাপ বেড়ে গেছে; কিন্তু চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত ফ্লাইট মিলছে না। কার্গো ফ্লাইট কমার কারণে কয়েক মাস ধরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন কমেছে। এই পথে আগে দৈনিক ৫০০-৫৫০ টন পণ্য পরিবহন হতো, এখন তা কমে ৩৯০-৪০০ টনে নেমেছে; অর্থাৎ আকাশপথে পণ্য পরিবহন ২০-২৫ শতাংশ কমেছে।
গত বছরের শেষ দিকে লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজে হামলার পর থেকে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে জাহাজ চলাচল করছে। ফলে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তিন-চার দিন বেশি সময় লাগছে। তাই সিঙ্গাপুর বন্দরেও কন্টেইনারের প্রবাহ বিলম্ব হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ছোট জাহাজগুলোকে আগের চেয়ে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার চট্টগ্রাম বন্দরেও যথাসময়ে কন্টেইনার মিলছে না। সব মিলিয়ে সময় বেশি লাগছে।
বর্তমান চলমান অনিশ্চয়তা ও কারফিউ এবং চলাচলে বাধার কারণে পণ্যবাহী ট্রাকও খুব বেশি চলছে না। এ জন্য রফতানিমুখী বিভিন্ন পণ্য বিশেষ করে পোশাকের চালান এখন বিমানবন্দরমুখী হয়ে উঠেছে। গত কয়েক দিনে বিমানে পণ্য রফতানির চাপ বেড়েছে। মূলত যেসব পোশাক শিল্পের মালিক সমুদ্রপথে জাহাজে পণ্য পাঠাতে পারছেন না, তারাই নিরুপায় হয়ে আকাশপথ বেছে নিয়েছেন।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক (বন্দর ও শুল্ক) মো. কামরুজ্জামান ইবনে আমিন বলেন, ‘গত কয়েক মাসে এমনিতেই বিমান ভাড়া বেড়েছে। এখন বাড়তি ভাড়া দিয়েও বিমানে জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত আমরা বিমান সংস্থাগুলোর কাছে স্পেস চাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রওনা দেওয়া যেত। এখন সাত দিনও অপেক্ষা করতে হয়।’
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানিগুলোর ওয়্যারহাউস ও বিমানবন্দরে এখন প্রায় দুই হাজার টন মালামাল ক্রেতাদের কাছে পাঠানোর অপেক্ষায় পড়ে আছে।
No comments
ধন্যবাদ।