জুলাই পেরিয়ে আগস্ট—বিজয়ের উল্লাস, সন্ধ্যায় বিষাদের ছায়া
জুলাই পেরিয়ে আগস্ট—আন্দোলন, সংঘর্ষ ও পালাবদলে উত্তাল বাংলাদেশ
২০২৪ সালের জুলাইজুড়ে চলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন এক নতুন মোড় নেয় আগস্টে গড়িয়ে। টানা আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের।
৫ আগস্ট দুপুরে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলতেই ছড়িয়ে পড়ে জল্পনা—শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সেই খবরেই ফেটে পড়ে উচ্ছ্বাস। ছাত্র-জনতা, সাধারণ মানুষ সবাই মিলে আনন্দে মেতে ওঠে। যদিও ক্যালেন্ডারে দিনটি ৫ আগস্ট, আন্দোলনকারীরা দিনটিকে আখ্যা দেন ‘৩৬ জুলাই’ নামে। তাদের ভাষায়, শেখ হাসিনার পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত জুলাই শেষ হয়নি।
এই দীর্ঘ আন্দোলনে প্রাণ হারান বহু শিক্ষার্থী। রাজধানী ঢাকায় যতটা উত্তেজনা ছিল, সারা দেশজুড়েই ততটাই ছিল সক্রিয়তা। সিলেটসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার ছাত্র-জনতা যুক্ত হয় আন্দোলনের সাথে। সিলেটের বিয়ানীবাজারেও ছড়িয়ে পড়ে উত্তাল আন্দোলনের ঢেউ।
আন্দোলনের দিন, বিজয়ের উল্লাস, সন্ধ্যায় বিষাদের ছায়া
৫ আগস্ট, ২০২৪—এই দিনেই বিয়ানীবাজার পৌর এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনজন তরুণ। শহীদদের মধ্যে ছিলেন রায়হান আহমদ, ময়নুল ইসলাম এবং থানার অভ্যন্তরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া তারেক আহমদ। একই দিনে সারা দেশে শহীদ হন আরও কয়েকজন, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাংবাদিক আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব।
দুপুরে আনন্দ মিছিল ও বিজয়ের চিত্র থাকলেও, সন্ধ্যায় ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। বিয়ানীবাজার থানার সামনে বিক্ষোভের সময় পুলিশ ভেতর থেকে গুলি চালায়। নিহতদের মৃত্যুসংবাদ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। রাতে থানার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় তারেক আহমদের মৃতদেহ।
শহীদ পরিবারগুলো আজও বিচারের আশায় প্রহর গুনছে। শহীদ রায়হানের ভাই সিয়াম আহমদ বলেন, "এক বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা চাই ন্যায়বিচার ও প্রকৃত হত্যাকারীদের শাস্তি।"
শহীদ তারেক আহমদের স্ত্রী ছামিয়া আক্তার বলেন, "আমার স্বামী দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন। গর্ব হয়। কিন্তু এখনো তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই—এ নিয়ে আমরা হতাশ। আমার সন্তান যেন গর্ব করে বলতে পারে—তার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন।"
আরও শহীদ, আরও অশ্রু
এই তিনজন ছাড়াও আন্দোলনের সময় বিয়ানীবাজারের আরও দুজন প্রাণ হারান। ১৮ জুলাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সাংবাদিক আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব। একই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে মারা যান বিয়ানীবাজারের চারখাই ইউনিয়নের কাকুরা গ্রামের বাসিন্দা সোহেল আহমদ।
মামলা, আসামি ও বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা
৫ আগস্টের ঘটনায় বিয়ানীবাজার থানায় মোট চারটি মামলা হয়—তিনটি হত্যা মামলা ও একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে। এসব মামলায় নাম রয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক ব্যক্তির, যাদের মধ্যে আছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লবসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। সাংবাদিকদেরও আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এখনও অনেক আসামি পলাতক।
থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশরাফ উজ্জামান বলেন, “চারটি মামলায় তদন্ত চলছে। যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলেছে, তারা চার্জশিটে থাকবেন। ইতিমধ্যে অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
প্রশাসনের আশ্বাস
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম মুস্তাফা মুন্না বলেন, “জুলাই আন্দোলনের শহীদরা আমাদের অনুপ্রেরণা। বৈষম্যহীন একটি দেশের স্বপ্ন তারা দেখিয়েছেন। তাদের পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।”

No comments
ধন্যবাদ।