Header Ads

Header ADS

এতোটা সহজ ছিল না ‘৩৬ জুলাই’

 

এতোটা সহজ ছিল না ‘৩৬ জুলাই’

৫ আগস্ট ২০২৪: একটি জনগণ-নির্ভর ঐতিহাসিক পালাবদল
৫ আগস্ট ২০২৪—এক স্মরণীয় দিন, যেদিন দেশের লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছিল দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন সম্ভাবনার পথে যাত্রা শুরু করতে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা, সারাদেশের শহর-বন্দর-গ্রাম থেকে ঢাকার দিকে রওনা হয় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে। তাদের দাবি ছিল এক দফা—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ।

২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের দাবিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হলেও, তৎকালীন সরকার আন্দোলনের মুখে চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা তুলে নেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের এক রায়ের মাধ্যমে কোটা পূর্ণবহাল হলে ফের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীরা ১ জুলাই থেকে কোটা সংস্কারের দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ শুরু করে, প্রথমদিকে যা সীমাবদ্ধ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ এলাকায়। প্রতিদিনই শাহবাগে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানাতেন শিক্ষার্থীরা। সময়ের সঙ্গে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

তবে আন্দোলনে উত্তেজনা বাড়ে ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। ওই বক্তব্যে তিনি শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ বলে ইঙ্গিত করেন এবং দাবিকে আইনগত বিষয়ে রূপ দিতে চান। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা স্লোগানে মুখরিত হন: ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’। রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একযোগে আন্দোলনে যুক্ত হয়।

১৫ জুলাই ছাত্রলীগকে মাঠে নামিয়ে শিক্ষার্থীদের দমন করা শুরু হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন যে, আন্দোলনকারীদের স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগ দেবে। এরপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালায়। ছাত্রীদেরও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। গুলি চালানো হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর।

১৬ জুলাই আন্দোলন চরমে পৌঁছায়—আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ছয়জন প্রাণ হারান, যার মধ্যে আবু সাঈদ ও ওয়াসিম অন্যতম। এই হত্যাকাণ্ডের পর কোটা আন্দোলন রূপ নেয় গণআন্দোলনে। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই সংকটের দায় সরকারের এবং সমাধানের দায়িত্বও সরকারের। আন্দোলনের পক্ষ থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি পেশ করা হয়। কিন্তু সরকার সেসব দাবির পরিবর্তে বেছে নেয় দমন-পীড়নের পথ। গুলিবর্ষণে প্রাণ হারান বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থীরাও। পরিবার, সহপাঠী, সাধারণ মানুষ সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

ধীরে ধীরে আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে এগিয়ে আসেন দেশের শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারাও ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়ান। আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও নুসরাত তাবাসসুম—এদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ডিবি কার্যালয়ে। সেখান থেকে জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বার্তা রেকর্ড করানো হয়। তবে আন্দোলন থামে না, বরং আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

১ আগস্ট ডিবি হেফাজত থেকে সমন্বয়করা মুক্তি পান। সেদিনই নিহতদের স্মরণে পালিত হয় 'রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ' কর্মসূচি। একইদিন কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও বরিশালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। সরকার কোটা আন্দোলনে ‘সন্ত্রাসী কার্যকলাপ’ চালানোর অভিযোগ এনে জামায়াত-শিবিরসহ তাদের অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ করে।

৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘তাদের জন্য গণভবনের দরজা খোলা।’ আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সরকার পতনের একদফা ঘোষণা করে এবং ‘অসহযোগ আন্দোলন’-এর ডাক দেয়।

এরপর আসে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। ৪ আগস্ট দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ৯৩ জন প্রাণ হারান। এমপি-মন্ত্রীদের বাড়িতে হামলার খবরও পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন জনগণকে আহ্বান জানান, ‘নাশকতা প্রতিরোধে শক্ত হাতে এগিয়ে আসুন’। এই অবস্থার মধ্যেই ৫ আগস্ট (মূলত ঘোষিত ৬ আগস্টের একদিন আগেই) অনুষ্ঠিত হয় বৃহৎ ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি, যেখানে লাখো ছাত্র-জনতা ঢাকামুখী হন। সেই দিনও রক্ত ঝরে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার শক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।

এইভাবে একটি কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরিণত হয় ইতিহাসের এক বিরল গণঅভ্যুত্থানে—যা শেষ হয় সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। ৩৬ জুলাই নামক এই দিনটি ইতিহাসে রয়ে যায় এক নতুন অধ্যায় হিসেবে, যেখানে ছাত্র-জনতার হাত ধরেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি রচিত হয়।

আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের বলেন, "৩৬ দিনের এই আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করা সহজ ছিল না। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার আমাদের ওপর গুলি চালিয়েছে, দমন-পীড়ন চালিয়েছে, কিন্তু আমরা থামিনি। শেষ পর্যন্ত জয় আমাদেরই হয়েছে—এ দেশের মানুষের হয়েছে।"

পূর্বপ্রসঙ্গে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে। সেই আন্দোলনে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলো। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে, যা জনগণের ক্ষোভ আরও তীব্র করে তোলে।

‘৩৬ জুলাই’ নামে চিহ্নিত ৫ আগস্টের সেই দিন, ঢাকার রাজপথে শুরু হয় মানুষের ঢল। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসমাবেশে উত্তাল হয়ে ওঠে নগরজীবন। দেশের বাইরে থেকেও এই ঘটনার প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে।

তীব্র গণচাপ ও অব্যাহত বিক্ষোভের মুখে, দিনটির শেষ ভাগে একটি নাটকীয় মোড় নেয় দেশের রাজনীতি। সন্ধ্যার দিকে সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়।ঠিক এক বছর আগে, আজকের এই দিনে, ইতিহাসের এক অনন্য মোড়ে পৌঁছায় বাংলাদেশ। প্রবল গণআন্দোলনের চাপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হন।

তাকে ঘিরে চলমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং হঠাৎ করে দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত—এসব নিয়ে তখন যেমন চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে, এক বছর পরেও সাধারণ মানুষের কৌতূহল কমেনি: কেন, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—সেই দিনটি ছিল টানটান উত্তেজনায় মোড়ানো। আগের রাতে একটি জরুরি নিরাপত্তা সভায় সারা দেশে কারফিউ জারি ও তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। অথচ বিপরীতে ছাত্র-জনতা স্লোগান তোলে: ‘কারফিউ ভাঙো, বাংলাদেশ বাঁচাও’। সকাল হতেই বিভিন্ন জায়গায় কারফিউ উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসে লাখো মানুষ।

এই পরিস্থিতিতে সকাল ১০টার দিকে গণভবনে জরুরি বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপস্থিত ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধান, আইজিপি, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানসহ রাষ্ট্রের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। সেখানে তিনি আন্দোলন দমনে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দেন, কিন্তু কর্মকর্তারা জানান—অবস্থা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাদের ভাষায়, আর হাতে সময় নেই। আন্দোলনের ঢেউ শাহবাগ পার হয়ে গণভবনের গেটের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

প্রথমে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে চাইলেও তাকে জানানো হয়, সেই সুযোগও তার নেই। কেবল ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হয় গণভবন ত্যাগের জন্য। কারণ, আন্দোলনকারীদের বিশাল মিছিল আর এত সময় দেবে না।

পরিস্থিতি বিবেচনায় সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বিকল্প পরিকল্পনা নেওয়া হয়। শেখ রেহানার সঙ্গে পৃথক কক্ষে আলোচনা শেষে তাকে অনুরোধ জানানো হয় শেখ হাসিনাকে বোঝাতে। পরে ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। জয় পরে গণমাধ্যমে জানান, ‘আমি মাকে রাজি করিয়েছিলাম।’

শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার শর্ত দেন: তিনি একটি ভিডিও বার্তা রেকর্ড করবেন, যা জাতির উদ্দেশে প্রচার করতে হবে। তবে পরিস্থিতির তীব্রতায় সেটাও সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে তাকে গণভবন থেকে সোজা হেলিকপ্টারে তুলে আনা হয় তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানবন্দরে। সেখান থেকে বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে করে ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দেশত্যাগ করেন।

ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে—শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং দেশ ছেড়েছেন। মুহূর্তেই বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে ঢুকে পড়ে। তার রেখে যাওয়া ব্যক্তিগত সামগ্রী, বইপত্র, এমনকি আসবাবপত্রও জনতা সঙ্গে নিয়ে যায়।

শেষবারের মতো বাংলাদেশের আকাশ পেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ছিলেন একটি সামরিক বিমানে। পরে সেটি দিল্লির নিকটবর্তী একটি বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

এই ঘটনাই ছিল দীর্ঘকাল ধরে চলা একনায়কতন্ত্রের পরিসমাপ্তি এবং একটি নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা। 

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের দীর্ঘদিনের একক দলীয় শাসনের অবসান ঘটে এবং নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো এই দিনটিকে “গণমুক্তির দিন” হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন রাজনৈতিক কাঠামো ও নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবিতে কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনকারীরা বারবার উচ্চারণ করছেন—গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার পথেই তারা অটল থাকতে চান।

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.