এক বছর পরও থামেনি স্বজনহারার কান্না
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভোলার ত্যাগ : এক বছর পরও থামেনি স্বজনহারার কান্না
২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করছিলেন ভোলার বিভিন্ন উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল রাজপথে যখন ছাত্র-জনতা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেমেছিল, তখন তাদের পাশে এসে দাঁড়ান ভোলার নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। কর্মব্যস্ততা ফেলে রেখে রাজধানীর রাজপথে ঢাকাবাসীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে নামেন তারা।
এই আন্দোলনে বিজয় ছিনিয়ে আনতে গিয়ে ভোলার বীর সন্তানরা প্রাণের মায়া করেননি। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের সময় হায়েনাদের নির্মম সহিংসতার শিকার হয়ে শহীদ হন ভোলার ৪৭ জন মানুষ। তাদের রক্তে ভিজে যায় ঢাকার রাজপথ।
আজ সেই আন্দোলনের এক বছর পার হলেও, ভোলার আকাশে এখনো ঘুরপাক খায় স্বজন হারানোর আর্তনাদ। সেই ভয়াল দিনগুলোতে কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ ভাই, কেউবা সন্তান কিংবা জীবনসঙ্গী। যারা ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে—তারা অনেকেই আর জীবিত ফিরে আসেননি। তাদের নিথর দেহ ফিরে গেছে গ্রামের কবরস্থানে, রেখে গেছে না বলা হাজারো গল্প।
রক্তাক্ত রাজপথে ভোলার বিসর্জন
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা ২১ দিনের গণআন্দোলনের মাত্র তিনদিনেই শহীদ হন ভোলার ৩৩ জন—
- ১৯ জুলাই শহীদ হন ১৩ জন
- ৪ আগস্ট শহীদ হন ১১ জন
- ৫ আগস্ট শহীদ হন ৯ জন
শহীদদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্র, দোকান কর্মচারী, গার্মেন্টসকর্মী, রাজমিস্ত্রি, রিকশাচালক, ইমাম, সিএনজি চালক, ট্রাক হেলপারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। এদের বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য।
শহীদদের পরিচয়
ঢাকায় শহীদ ভোলাবাসীর মধ্যে—
- ভোলা সদর: ১২ জন
- দৌলতখান: ৩ জন
- তজুমদ্দিন: ১ জন
- লালমোহন: ১১ জন
- চরফ্যাশন: ১২ জন
- বোরহানউদ্দিন: ৯ জন
ভোলা সদর থেকে শহীদদের মধ্যে আছেন—ইলেকট্রিক মিস্ত্রি শামিম হাওলাদার, ছাত্র মিরাজ ফরাজী, রিকশাচালক ইমন, ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন, মুদি দোকানি মহিউদ্দিন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী শাকিল, শ্রমিক রনি, সিকিউরিটি গার্ড আলাউদ্দিন, গাড়িচালক বাবুল, জসিম উদ্দিন, শুভ ও হাছান।
দৌলতখান থেকে শহীদ হন—শাহজাহান, রিয়াজ, শাহিন।
বোরহানউদ্দিন থেকে শহীদ—নাহিদুল ইসলাম, সুজন, ইয়াছিন, জামাল, দীপ্ত দে, লিজা আক্তার, নয়ন, জাকির, সোহেল রানা।
তজুমদ্দিন থেকে শহীদ—ঝুট ব্যবসায়ী মনির হোসেন।
লালমোহন থেকে শহীদ—আরিফ, মোছলেহ, আক্তার, শিহাবউদ্দিন, শাকিল, হাবিবুল্লাহ, সাইদুল, ওমর ফারুক, সবুজ, আক্তার হোসেন, হাসান।
চরফ্যাশন থেকে শহীদ—সিয়াম, রাকিব, সোহাগ, মনির, ফজলু, ফজলে রাব্বি, হাসনাইন, মমিন, হোসেন, হাবিবুর, ওমর ফারুক ও তারেক।
স্বজনহারাদের বুকফাটা আর্তনাদ
দৌলতখানের শহীদ শাহজাহানের স্ত্রী ফাতেহা বেগম বলেন, “আমার স্বামী নিউমার্কেটে পাপস বিক্রি করতেন। আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আমাদের আট মাসের সন্তান বাবার মুখ দেখতে পায়নি।”
ভোলা সদরের শহীদ রনির মা মাইনুর বেগম বলেন, “সকালবেলা ছেলেকে ফোনে বলেছিলাম, বাইরে যাস না, ভাত না খাইলেও মানুষ মরে না। বিকেলেই ফোন আসে, রনির মরদেহ পড়ে আছে ঢাকা মেডিকেলে। সে তো আমার মুখে খাবার তুলে দিত, এখন নিজেই খেতে পাই না।”
নাহিদুল ইসলামর মা বিবি ফাতেমা বলেন, “আমার বুকের মানিককে গুলি কইরা মাইরা ফেলছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে ছিল। এত মেধাবী, নিজে চাকরি করে পড়াশোনা করত। এখনো মনে হয়, সে দরজায় টোকা দেবে।”
শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি প্রতিশ্রুতি
ভোলার জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সর্বোচ্চ সংখ্যক শহীদ দিয়েছে ভোলা। শহীদ পরিবারগুলোর ক্ষতি অপূরণীয়, তবে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার কোনো কমতি রাখা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও প্রশাসন সবসময় পাশে থাকবে।”
ভোলার শহীদ পরিবারগুলোর কান্না এখনো থামেনি। কারও কান্না ছেলের জন্য, কারও স্বামীর জন্য। এ কান্না যেন কখনোই ফুরায় না। তাদের রক্ত শুধু রাজপথ রঞ্জিত করেনি, আমাদের বিবেকেও কড়া নাড়ে বারবার।
এই শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা এবং দায়িত্ব—তাদের রক্ত যেন বৃথা না যায়।

No comments
ধন্যবাদ।