ছেড়েছি সব অসম্ভবের আশা – বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়-চাপা দিন
চাঁদের মতো স্বপ্ন সরে যায়
রোপওয়ে ধরে পৌঁছে যাই আমি
মোহনা থেকে অন্য মোহনায়
লবণহ্রদে মিষ্টি ঘর বাড়ি
আকাশে উড়ে ল্যাংড়া কোনো ঘোড়া
বাঁকুড়া থেকে কিনেছি কম দামে
হাত-পা-মাথা শিল্প দিয়ে মোড়া
শিল্প দিয়ে ধুয়েছি চোখ মুখ
শিল্প মেখে খেয়েছি কত ভাত
মধ্যিখানে শিল্প ছিল বলে
এড়িয়ে গেছি অনেক সংঘাত
অহিংসাই গর্ভ থেকে তাও
পায়ের নীচে জন্ম নিল ঘাস
আমাকে তুমি জন্তু ভেবেছিলে
তোমাকে আমি ভাবিনি মিনিবাস
কখনো তাই দেইনি রুট ম্যাপ
বলেছি—যাও, ইচ্ছে মতো ঘোরো
শুধু তাই নয় যৌন কাতরতা
কাতর হয়ে রয়েছে অন্তরও
শূন্য মুখে চুমু খাওয়ার স্মৃতি
তাকেও তাড়া করছে নিশিদিন
ক্লান্ত ভেবে দিয়েছি যাকে জল
তৃষ্ণা তাকে করেছে ক্ষমাহীন
চেয়েছি চাল ক্ষমার মতো করে
পেয়েছি পোকামাকড়, লতাপাতা
দেয়াল ছুঁয়ে বুঝেছি ইঁটগুলো
কয়েদিদের ভাগ্য নির্মাতা
বন্দিদশা কামড়ে ধরো দাঁতে
প্রণাম করো নির্মাতার পায়ে
তোমাকে আমি বিস্কুটের মতো
ডুবিয়ে নেব ডাবল-হাফ চায়ে
চামচে দিয়ে তুলব তারপরে
দেখব তুমি নরম নাকি শক্ত
ভালোবাসার অন্য মানে নেই
রক্তে শুধু মিশতে থাকে রক্ত
রক্তবীজ তোমারই সন্তান
সম্পর্কে আমারও কেউ হয়
চালালে ছুরি ফিনকি দিয়ে ধারা
গড়িয়ে যায়ৃতবুও অব্যয়
আমাকে তুমি খরচা করে তােড়ে
ফুরিয়ে ফেল ভীষণ অপচয়ে
রক্ত, এত রক্ত দেখে আমি
বোবার মতাে সিঁটিয়ে আছি ভয়ে
গর্ত খুঁড়ে বেরিয়ে আসা সার
ঢুকতে হবে অন্য কোনও ঘােরে
পাহাড় থেকে উপচে ওঠা জল
ঝরনা শুষে নিচ্ছে প্রাণভরে
হিংসে, বড় হিংসে করি ওকে
ত্রিভুজ থেকে একটা কোনও বাহু
সরিয়ে নিয়ে লাঠির মতাে ধরি
আমাকে ধরে আদর করে রাহু
কেতুর কথা বলাও লােকসান
অনুভূতির অন্ধকার ঘরে
ও এতখানি নিঃস্ব, বেপরােয়া
যতটা পারে শ্লীলতাহানি করে
বানিয়ে ছাড়ে সমাজচ্যুত ঢপ
ছাড়ার আগে ধরিয়ে দেয় নেশা
রাস্তা, এঁদোগলিতে, ফুটব্রিজে
কুকুর ডাকে, শুনতে পাই হ্রেষা
চাবুক কোনও চাবুক চাই না তাে
পক্ষীরাজ, আমি তােমার ডানা
আমাকে তুমি মিশিয়ে দাও মেঘে
তুমি তাে নও বাঁকুড়া থেকে আনা
না যদি তবে মাটিতে ঠোকো ক্ষুর
তুমি তাে নও কেবলই ভঙ্গিমা
বিশ্বরূপ দেখতে চাইছি না
দেখাও অনুতাপের পরিসীমা
যেখানে জলদস্যুগুলাে সব
দাঁড়িয়ে থাকে যেন বা জলঘট
মাংস আর চর্বি মিলেমিশে
চেতনা, চৈতন্য, যানজট
মুক্তিপথে সাধক নয় একা
বাঁ পাশে তার সাধনসঙ্গিনী
চিনিনি চোখে কুয়াশা ছিল বলে
কুয়াশা, আমি তোমার কাছে ঋণী
ধার বাকির ভিতরও হুল্লোড়
ছুটছে কাঁচা শ্যাম্পেনের মতাে
আকাশ থেকে বাতিল হওয়া তারা
মাটিতে নেমে এসেও বিব্রত
বোঝে না লোকে কি ভাবে মুখ বুজে
সহ্য করে প্রেমের অপমান
ভাষার চক্রান্তে মেনে নেয়
দানের পাশে বসানো প্রতিদান
মানি না, আমি মানিনি কোন দিন
কল্পতরু—নিজেও কল্পনা
ছিনিয়ে নেবে হ্যাঁচকা টান দিয়ে
দিও না কানে অন্য কারও সােনা
লাগুক রং মাটির মূর্তিতে
পলকে জ্বলে উঠুক ত্রিনয়ন
খয়েরি, নীল, গোলাপি মিথ্যায়
সত্য শুধু—ভবতারিণী মা
হারিয়ে যারা ফেলেছে—পাক পথ
প্রশ্ন যারা করেছে—উত্তর
বরফ যদি ডুবতে চায় মদে
মৃত্যু তুমি হয়ো না তৎপর
পাথর মেলে ধরুক বিষদাঁত
তুলুক ফণা নিথর কালাে জলও
বর্তমান তবুও ঘটমান
আমাকে প্রভু শিকাগো যেতে বলাে
মাটির নীচে প্রাচীন কোনও খনি
আকাশে লাঠি ঠকঠকায় শনি
ইতিহাসের দু’পায়ে অভিশাপ
কপালে তবু নাচতে থাকে মণি
ফিরিয়ে দাও আমাকে তার দ্যুতি
যতই হােক ত্রুটি বা বিচ্যুতি
স্বাতীর জলে মুক্তো জন্মাবে
তখনও পচে মরবে অনুভূতি?
নাকি সে কোনও পায়ের ভেজা দাগ
বেরিয়ে এসাে মানুষখেকো বাঘ
মানুষহীন অন্য জঙ্গলে
রক্ত ছাড়া খেলতে হবে ফাগ
খেলতে হবে শরীর ছাড়া ছৌ
মহুয়া থেকে খসাতে হবে মৌ
বুঝতে হবে বাচ্চাগুলাে দেখে
জাতিস্মর হননি পিতরৌ
কংক্রিটের মস্ত ঘেরাটোপে
বেড়াল বসে তা দিয়ে যায় গোঁফে
হয়েছে শুধু বলির আয়ােজন
ধড় আর মাথা আলাদা এক কোপে
রাস্তা চলে ডিভাইডার নিয়ে
জুড়ছি তবু ইট-সিমেন্ট দিয়ে
দিচ্ছি প্রতিবাদের মতাে করে
পুতুল আর পুতুলানির বিয়ে
ছড়িয়ে পড়া কর্কটের দেশে
যেখানে কফ রক্তে এসে মেশে
মিশুক, ওরা আদরে মিশে যাক
ধ্বংস হােক নিমেষে, ভালবেসে
পচনশীল আমার দিনরাত
পচনশীল হাঁড়িতে চাপা ভাত
জ্যান্ত সব প্রেম আর পূজা নাকি
নিষ্ঠুরতা ঢাকার অজুহাত?
তাহলে পরে বন্ধ করো গান
বুলবুলিকে দিও না খেতে ধান
পৃথিবী যদি মানুষ হত শুধু
দেবতা আমি হতেই পারতাম
হয়নি, তাই হয়েছি আঁটকুড়াে
হাতের থেকে ওড়ে চকের গুঁড়ো
সামনে বুনাে মােষ বা ব্ল্যাকবাের্ড
আমারই মতাে ধ্বস্ত আর বুড়াে
নিজেকে তার দৃষ্টি দিয়ে দেখে
স্বপ্ন ঢেলে ঘেন্নাগুলাে মেখে
লিঙ্গ বিভাজনের জটিলতা
বােঝাৰ মুখে, বােঝাব না তাে এঁকে
আগুন লাগা ট্রেনের কামরায়
ঝুলতে থাকা তপ্ত চামড়ায়
আঁকব আমি আমার ডিজাইন
রাধাকে ফেলে পালানাে শ্যামরায়
পালাতে গিয়ে সেও তাে দিশেহারা
নিজের কাছে নিজেই বাঁধে নাড়া
পরক্ষণে খুলতে থাকে সুতাে
তােমার ঘর কোথায় বানজারা?
হারিয়ে যদি ফেলেছ নিঃঝুমে
খুঁজো না, আর খুঁজো না বাথরুমে
উঠলে পরে নামতে হবে নীচে
জাগলে ঢলে পড়তে হবে ঘুমে
ঘুমের কাছে চলে না অভিনয়
তাই তাে জল মিশিয়ে খেতে হয়
লুপ্ত, অবলুপ্ত হতে হতে
জানাতে হয় নিজের পরিচয়
যখন নীচে পুড়তে থাকে স্টোভ
একলা কথা ছুড়তে থাকে ক্ষোভ
দ্রাঘিমা আর অক্ষরেখা নিয়ে
অন্ধকারে ঘুরতে থাকে গ্লোব।

No comments
ধন্যবাদ।