ফিরে দেখা রক্তাক্ত ৩ আগস্ট : কোটা সংস্কার আন্দোলন
ফিরে দেখা ৩ আগস্ট: যখন ঢাকার আকাশে ভেসেছিল এক দফার স্লোগান
২০২৫ সালের ৩ আগস্ট, যা আন্দোলনকারীদের ক্যালেন্ডারে ছিল ৩৪ জুলাই, সেই দিন ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সৃষ্টি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব জনস্রোতের। ভোর থেকেই রাজধানীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ দলে দলে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেলে গোটা এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। প্রকম্পিত হয় শহরের আকাশ-বাতাস—“এক দফা, এক দাবি—হাসিনার পদত্যাগ” স্লোগানে।
এই দিনটি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্ব ঘোষিত কেন্দ্রীয় কর্মসূচি। আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম মঞ্চে উঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এক দফার ঘোষণা দেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, “শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারকে বিদায় করতে হবে। এর বাইরে কোনো সংলাপ নয়, কোনো আপস নয়।”
তিনি আরও বলেন, “এই সরকারের হাতে ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ—কেউ নিরাপদ নয়। আজ যে রাষ্ট্রে ছাত্রদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত, সে রাষ্ট্রে এই সরকারের আর থাকার ন্যূনতম নৈতিক অধিকার নেই।”
শিল্পী, পেশাজীবী, রাজনীতিকদের সংহতি
তৎকালীন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে একাত্মতা জানিয়ে দেশের খ্যাতনামা ব্যান্ড ও সংগীতশিল্পীরা সেদিন শহীদ মিনারে গিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। বক্তব্য দেন অনেকে, গান গেয়ে তুলেন প্রতিবাদের সুর।
এছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারাও সেদিন সমাবেশে যোগ দিয়ে জনগণের পক্ষে অবস্থান জানান। বিকেলে রাজনৈতিক সমর্থন জোরদার হয়, যখন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আমরা কেবল নৈতিক সমর্থনই নয়, ছাত্রদের এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে সক্রিয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”
সরকারপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা কর্মসূচি
এই উত্তাল জনমতকে শান্ত করতে রাতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপাচার্য, অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। আলোচনার আহ্বান জানান আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে। তবে ছাত্র-জনতা তখন আর আপসের পথে ফিরে যাওয়ার অবস্থায় ছিল না।
একই সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দেন। ৩ আগস্ট থেকেই আওয়ামী লীগ সারা দেশে জমায়েত ও শোডাউনের কর্মসূচি পালন করবে বলে জানান তিনি।
সেনাবাহিনীর অবস্থান
জনমনে তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হবে? সেদিন ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’-এ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে।” এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের মনে আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে।
ইতিহাসের মোড় ঘোরানো দিন
এরপর আন্দোলন আরও বেগবান হয়। রাজপথের চাপ, আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরকার ভাঙনের প্রেক্ষিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা গোপনে দেশত্যাগ করেন। অবসান ঘটে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে।
শহিদ মিনারে ছাত্র জনতার এক দফা ঘোষণা, শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি
২০২৫ সালের ৩ আগস্ট (গণঅভ্যুত্থান ক্যালেন্ডারে ৩৪ জুলাই), বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এক বিশাল সমাবেশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগ দাবি করে ‘এক দফা’ আন্দোলনের সূচনা করেন। বিকেল ৫টার দিকে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি ঘোষণা করেন এবং শেখ হাসিনার সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।
এর আগে সকালে গণভবনে পেশাজীবী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে বসতে চাই। কোনো সংঘাত চাই না।” তবে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা শুধু শেখ হাসিনার নয়, পুরো মন্ত্রিসভার পদত্যাগ চাই। আমরা সকল হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের বিচারও দাবি করি।”
তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে আর কখনো স্বৈরাচার ফিরে না আসে।” তিনি জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে ‘জাতীয় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন।
এক দফা আন্দোলনের প্রস্তুতি ও ১৫ দফা কর্মসূচি
আন্দোলনের অন্য সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজিব ১৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:
- কর ও ইউটিলিটি বিল বর্জন
- অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা বন্ধ
- প্রবাসী রেমিট্যান্স বন্ধ
- সব সরকারি সভা-সেমিনার বয়কট
- গণপরিবহন বন্ধ
- ব্যাংক শুধুমাত্র জরুরি লেনদেনের জন্য রোববার খোলা থাকবে
- পুলিশ শুধুমাত্র থানায় দায়িত্ব পালন করবে
- সেনাবাহিনী ব্যারাকেই থাকবে, শুধু বিজিবি ও নৌবাহিনী উপকূল এলাকায় দায়িত্ব পালন করবে
- আমলারা সচিবালয়, জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে যাবেন না
- বিলাসবহুল দোকান ও রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকবে
জনস্রোতে মুখর শহিদ মিনার এলাকা
সকাল থেকেই টানা বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহরের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ জাতীয় পতাকা ও ব্যানার হাতে শহিদ মিনারে আসতে থাকেন। দোয়েল চত্বর, জগন্নাথ হল, ঢাকা মেডিকেল গেট ও শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে জনসমাবেশ। স্লোগান ছিল একটাই—“দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ।”
বিকেলে বিক্ষোভ শেষে টিএসসি এলাকায় রাজু ভাস্কর্যের চোখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতীকী প্রতিবাদ করা হয়। সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা।
রাজধানীর বাইরে এবং ভেতরে অন্যান্য এলাকায়ও অবস্থান কর্মসূচি ও অবরোধ চলে—বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মিরপুর, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, যাত্রাবাড়ী, শাহবাগসহ বহু এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
সহিংসতা ও সংঘর্ষ
বিক্ষোভ চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ঘটে। ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, সিলেট, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও গাজীপুরে পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ ওঠে। গাজীপুরে একজন বিক্ষোভকারী নিহত হন।
চট্টগ্রামে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবনে হামলা ও গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। একইদিন চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।
বগুড়ায় শহরের একাধিক স্থানে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে ছয়জন গুলিবিদ্ধ হন। কুমিল্লায় রেসকোর্স এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা সরাসরি গুলি চালায়। রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য বরখাস্ত হন।
মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারসমূহ বিচারের দাবিতে সভা করে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা বিক্ষোভ করে এবং চার সাংবাদিক হত্যার বিচার ও সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন।
সেনাবাহিনীর প্রধানের বার্তা
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান হেলমেট অডিটোরিয়ামে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্যে বলেন, “জনগণের জীবন, সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনী দায়বদ্ধ।” তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজব সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই পরিস্থিতিতে, ২২ জন মার্কিন সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে এক চিঠিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানান এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।

No comments
ধন্যবাদ।