তাজিংডং পর্বত—বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চতম শৃঙ্গ
অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়া পাহাড়ের রাজ্য বান্দরবান। উঁচুনিচু আঁকাবাঁকা পথ, সবুজে ঢাকা পাহাড়ের বুকে মেঘের খেলা—সব মিলিয়ে এক অনন্য সৌন্দর্যের অভয়ারণ্য। এই অপার সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশ একে ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য স্বপ্নের গন্তব্যে পরিণত করেছে। বান্দরবানের অনেক পাহাড়ই যেমন দুর্গম, তেমনি রোমাঞ্চকর। এসব পাহাড়ের আহ্বান যেন প্রতিনিয়ত টানে এডভেঞ্চারপ্রিয় ভ্রমণপিপাসুদের।
বিশেষ করে ট্রেকারদের জন্য বান্দরবানের পাহাড়শ্রেণি এক স্বর্গসদৃশ অভিজ্ঞতা। কঠিন পথ, প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ, আর পাহাড়ি জনপদের রহস্যময় সৌন্দর্য—সব মিলে এখানে আসা হয় একরকম আত্ম-অন্বেষণের যাত্রা। আর এই যাত্রার অন্যতম গন্তব্য হলো তাজিংডং পর্বত—বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চতম শৃঙ্গ, যেটি এডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এক বড় আকর্ষণ।
কীভাবে যাবেন তাজিংডং
প্রথমেই আপনাকে পৌঁছাতে হবে বান্দরবানে। দেশের প্রায় সব জেলা থেকেই বান্দরবানের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। ঢাকার কলাবাগান, সায়দাবাদ বা ফকিরাপুল থেকে শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিনসহ বিভিন্ন পরিবহনের নন-এসি ও এসি বাস প্রতিদিন বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
অন্যদিকে, চাইলে আপনি ট্রেনে করে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে বান্দরবান যেতে পারেন। চট্টগ্রামের বদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে পূবালী বা পূর্বানী পরিবহনের বাসে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর বান্দরবান রওনা হওয়া যায়।
বান্দরবান শহরে পৌঁছে তাজিংডং যেতে হলে আপনাকে যেতে হবে রুমা বাজার। এটি শহর থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে। সেখানে যেতে পারেন লোকাল বাস কিংবা দলগতভাবে জীপ (চাঁন্দের গাড়ি) ভাড়া করে। লোকাল বাস প্রতি ঘণ্টায় একবার রুমার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তবে দলবদ্ধ ভ্রমণের জন্য জীপই বেশি উপযোগী—একটি জীপে ১০–১৫ জন যেতে পারবেন এবং ভাড়া পড়বে ৩০০০–৪০০০ টাকার মতো। জীপে যেতে সময় লাগবে প্রায় ২ ঘণ্টা।
রুমা বাজারে পৌঁছে গাইড ঠিক করতে হবে এবং রওনা হবার আগে আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হবে। নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়, এবং মনে রাখতে হবে—বিকেল ৪টার পর অনুমতি দেওয়া হয় না।
এরপর শুরু হবে প্রকৃত ট্রেকিং-যাত্রা। রুমা সদর থেকে পায়ে হেঁটে বগালেক, কেওক্রাডং পেরিয়ে আপনাকে যেতে হবে তাজিংডংয়ের চূড়ায়। এই পথে প্রকৃতি যেমন আপনাকে বিস্মিত করবে, তেমনি প্রতিটি ধাপেই পাবেন এডভেঞ্চারের নতুন স্বাদ।
কোথায় থাকবেন
বান্দরবানে থাকার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মান ও দামের হোটেল, রিসোর্ট, মোটেল ও গেস্টহাউস। এখানে পাওয়া যায় দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে মানসম্মত কক্ষ। এ ছাড়া পাহাড়ি অঞ্চলে ট্রেকিংয়ের সময় রাতে তাঁবুতে রাত কাটানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
বান্দরবানের কিছু রিসোর্ট বা কটেজেও পরিবারসহ থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে খরচ পড়বে রুমপ্রতি ২ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেলেও নিরাপদে রাত যাপন এবং খাবারের ব্যবস্থা আছে, যেখানে প্রতিদিনের খরচ পড়বে দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা।
কিছু পরামর্শ
- পায়ে হাঁটা দীর্ঘ এবং শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জিং, তাই আগে থেকেই শারীরিক প্রস্তুতি নিন।
- গাইড ছাড়া না যাওয়া নিরাপদ।
- স্থানীয় নিয়মনীতি, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে দায়িত্বশীল থাকুন।
- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করুন, কিন্তু প্রকৃতিকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না।
বান্দরবান শুধু একটি গন্তব্য নয়—এ এক অনন্য অভিজ্ঞতার নাম। তাজিংডংয়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে পুরো পথের ক্লান্তি ভুলে যাবেন এক নিমিষে।

No comments
ধন্যবাদ।