Header Ads

Header ADS

স্ত্রীর সঙ্গে শহীদ মাসুদ রানার শেষ কথা

শহীদ মাসুদ রানা মুকুল

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পদত্যাগের আগের দিন, ঢাকা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মাসুদ রানা মুকুল (৩৫)। তখন চলছিল সরকার পতনের আন্দোলন।

মুকুল ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের আব্দুর রায়হান ও জাহানারা খাতুনের ছোট ছেলে। পরিবারের মধ্যে তিন ভাই ও দুই বোন ছিলেন। মুকুল ঢাকার মিরপুর-১ নম্বরে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতেন।

৪ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মুকুল মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় পানির বোতল ও বিস্কুট নিয়ে অবস্থান করছিলেন। তখন একটি গুলি তাঁর মাথার পেছন থেকে ঢুকে বাম কানের ওপর দিয়ে বের হয়ে যায়। আহত মুকুলকে উদ্ধার করে আলোক হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সে ভর্তি করা হয়। রাত সোয়া একটার দিকে চিকিৎসকদের চেষ্টায় তিনি জীবনবাঁচাতে পারেননি।

মুকুলের জন্ম ১৯৯০ সালের ২৩ ডিসেম্বর। প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছিলেন কয়রাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, পরে গোকুলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি পাস করেন। কুষ্টিয়া পলিটেকনিক কলেজ থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ২০১২ সালে চাকরির খোঁজে ঢাকায় আসেন এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। সর্বশেষ স্মার্ট এলিভেটর কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। ছয় মাস আগে দুই বন্ধুর সঙ্গে ‘এমএস ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেছিলেন।

২০২৫ সালের ১৬ জুন মুকুলের গ্রামের বাড়িতে গেলে সেখানে নীরবতা বিরাজ করছিল। কথা হয় পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে। শহীদ মুকুলের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সাফা ও তাঁদের চার বছর বয়সী মেয়ে আরোবী নিয়ে বাস করছিলেন ঢাকায়। আর্থিক সমস্যার কারণে গত মাসে তারা ঢাকায় থাকা ছেড়ে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে এসেছেন। সাফা জানালেন, মুকুল ৪ আগস্ট সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বলেছিলেন আধাঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসবেন। কিন্তু আর ফিরে আসা হয়নি।

সাফা বলেন, মুকুল আন্দোলনরত ছাত্রদের পানি ও বিস্কুট বিতরণ করতেন। ওই দিনও তিনি তাই করছিলেন। বিকেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে যান। চিকিৎসকদের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত মুকুলের জীবন বাঁচেনি।

মুকুলের মৃত্যুর পর পরিবার ও প্রতিবেশীরা অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছেন। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন তারা। তবে মুকুলের নামে এখনও কোথাও কোনো স্মৃতিফলক বা ফলক নেই এবং তার কবরস্থানের যত্ন নেওয়া হয় না।

মুকুলের মা জাহানারা খাতুন আবেগঘন কণ্ঠে জানান, ছেলের কথা ভুলতে পারেন না তিনি। মৃত্যুর আগের কয়েকদিনও ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। মুকুলের ভাইপো রোমান জানায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় যখন হল বন্ধ ছিল, তখন সে চাচার বাসায় থেকে পড়াশোনা করত।

প্রতিবেশী জুননুন বলেন, মুকুল ছিল শান্ত ও ভালো মানুষ, যার অবদান জাতি ভুলবে না। তিনি পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার আহ্বায়ক আসলাম হোসেন অর্ক বলেন, মুকুলের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সামাজিক মর্যাদা দেওয়া উচিত। শিগগিরই স্মৃতিফলক নির্মাণ ও কবরস্থান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তার পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.