আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় শহীদ বায়েজিদ বোস্তামির লাশ
শহীদ বায়েজিদ বোস্তামি: ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের আরেক অমর নাম
মাত্র ছয় মাসের ছেলেকে ঘরে রেখে রাজপথে নেমেছিলেন বায়েজিদ বোস্তামি, লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনা সরকারের পতন।
গত ৫ আগস্ট ২০২৪, কারফিউ ভেঙে বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকার আশুলিয়ায় যোগ দেন আন্দোলনে। সেখানেই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন মাত্র ২৩ বছর বয়সী বায়েজিদ। তবে মৃত্যুই ছিল না শেষ, পুলিশ তার লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেয়, যাতে পরিবারের কেউ তাকে শেষবারের মতো দেখতেও না পারে।
শহীদের পরিচয়
নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার উমার ইউনিয়নের কৈগ্রাম ফার্সিপাড়া গ্রামের সন্তান বায়েজিদ। পিতা মৃত সাখাওয়াত হোসেনের দ্বিতীয় ছেলে। তার বড় ভাই কারিমুল ইসলাম (২৫), ছোট বোন উম্মে সালমা রুমী (১৭) এবং স্ত্রী রিনা আক্তার (২০)।
প্রেমের সম্পর্ক থেকেই বিয়ে, তাদের ঘর আলোকিত করে একমাত্র পুত্র রাফি আব্দুল্লাহ, যার বয়স এখন মাত্র ১৩ মাস।
হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড
শহীদ বায়েজিদের স্ত্রী রিনা আক্তার বলেন,
“বায়েজিদ সেদিন দুপুরে আশুলিয়ায় আন্দোলনে যায়। সেখানে ‘ভারতীয়’ পোশাকে থাকা পুলিশ বায়েজিদসহ ১৩ জনকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর একটি গাড়িতে তাদের লাশ নিয়ে গিয়ে রাস্তায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।”
পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী লাশ উদ্ধার করে শহীদ জানাজার আয়োজন করে এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। তাকে দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।
পরিবারের কণ্ঠে বেদনার বহিঃপ্রকাশ
মা বেনু আরা বলেন,
“অনেকেই আন্দোলন শেষে ঘরে ফিরেছে, আমার ছেলে আর কোনোদিন ফিরবে না। আমি শুধু আমার ছেলের না, সব শহীদের হত্যাকারীদের বিচার চাই।”
স্ত্রী রিনা আক্তার বলেন,
“আমার সন্তান এখনও বোঝে না তার বাবা আর নেই। আমি শুধু সুবিচার চাই— আমার স্বামীর হত্যাকারীরা যেন শাস্তি পায়।”
বড় ভাই কারিমুল ইসলাম বলেন,
“আমরা গরিব পরিবার। বায়েজিদ তার সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারকে সাহায্য করত। এখন সে নেই, কিন্তু অনেকে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে— তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে বিচার চাই সেই নৃশংস হত্যার।”
ছোট বোন রুমী বলেন,
“আমার ভাই উত্তরা আইডিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টসে পার্টটাইম কাজ করত। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সে ছিল অগ্রভাগে। তাকে গুলি করে হত্যা করে, এরপর আগুন দিয়ে লাশ পুড়িয়ে দেয়।”
সহায়তা ও স্মরণ
-
ধামইরহাট এমএম ডিগ্রি কলেজ শহীদ বায়েজিদের ভাই কারিমুল ইসলামকে মাস্টার রোলে চাকরি দিয়েছে। বোন রুমী কলেজে ভর্তি হলে সম্পূর্ণ খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পড়ালেখা শেষে চাকরির ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দিয়েছে অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম।
-
আল ইত্তেহাদ ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুল্লাহ বিন বেলাল জানান, বায়েজিদের সন্তান রাফি আব্দুল্লাহর ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেবে ফাউন্ডেশন।
-
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল জানান, বায়েজিদের পরিবারকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হয়েছে, একইসাথে আরও ৭ শহীদ পরিবারের প্রত্যেককে একই সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
শহীদ বায়েজিদের আত্মত্যাগ কখনও ভুলবে না এই দেশ। তার জীবন, সাহস ও আত্মোৎসর্গ আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল।

No comments
ধন্যবাদ।