উত্তরায় ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা, নিহত ও আহত
উত্তরায় ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা: স্কুলে আছড়ে পড়ে যুদ্ধবিমান, নিহত ২২, আহত শতাধিক
সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়িতে মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে বিধ্বস্ত হয়। দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়নের পর বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কুল ভবনের সিঁড়ির সামনে আছড়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২২ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১০৪ জন, যাদের অধিকাংশই স্কুলশিক্ষার্থী।
আগুন আর আতঙ্কে মৃত্যু ও বিভীষিকা
ছুটি শেষে বাসায় ফেরার অপেক্ষায় থাকা খুদে শিক্ষার্থীদের চোখের সামনে উড়োজাহাজটি হেলেদুলে স্কুলের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে ভবনের প্রবেশমুখে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের ভেতর এবং শিক্ষার্থীদের শরীরে। অনেকেই স্কুলের ভেতরে আটকে পড়েন, আগুনে দগ্ধ হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করেন, কেউ আহত অবস্থায় হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
দুর্ঘটনার কারণ ও তদন্ত
আইএসপিআর জানায়, বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান। এটি নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে উড্ডয়ন করেছিল। প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটিকেই দায়ী করা হলেও, ঘটনাটি তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পাইলটের শেষ চেষ্টা
পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম জনবহুল এলাকা এড়িয়ে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্কুল ভবনে আছড়ে পড়া এড়াতে পারেননি। পাইলটও দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
নিহত ও আহতদের সংখ্যা
সন্ধ্যা পর্যন্ত আইএসপিআর জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২২ জন, যাদের মধ্যে অনেকে এখনও শনাক্ত হননি। অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, ৭ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করতে হবে। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট, সিএমএইচ, কুর্মিটোলা, লুবনা জেনারেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ৮৮ জন ভর্তি আছেন। ২৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ
চোখের সামনে এমন বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে শোকাহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। অনেকেই দগ্ধ অবস্থায় সাহায্যের জন্য ছুটে বের হন। শিক্ষার্থীদের কথায় জানা যায়, বিমানের শব্দে প্রথমে চমকে ওঠেন তারা। পরের মুহূর্তেই জ্বলে ওঠে আগুন, ছুটে বেড়াতে থাকে আগুনে পোড়া শরীর।
উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা
প্রথমেই শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার কাজে নেমে পড়েন। এরপর সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, র্যাব ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেনা সদস্যরা নিজেরাই আহতদের ভ্যানে ও মোটরসাইকেলে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে থাকেন। শিক্ষার্থী, রিকশাচালক ও পথচারীরাও এ কাজে সহযোগিতা করেন। সড়কে রক্তদাতা, পানি সরবরাহকারী ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
হাসপাতালগুলোতে হিমশিম অবস্থা
একসঙ্গে এত দগ্ধ রোগী সামলাতে গিয়ে বার্ন ইনস্টিটিউট, কুর্মিটোলা ও অন্যান্য হাসপাতালগুলো হিমশিম খেতে শুরু করে। আহতদের ভর্তি করা হয় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, বার্ন ইনস্টিটিউট, সিএমএইচ, কুর্মিটোলা, উত্তরা লুবনা ও আধুনিক হাসপাতালসহ আটটি প্রতিষ্ঠানে।
রাষ্ট্রীয় শোক ও প্রতিক্রিয়া
আজ মঙ্গলবার (২২ জুলাই) এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক আবেগঘন ভিডিও বার্তায় শোক প্রকাশ করেন। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শোক ও সহানুভূতি প্রকাশ করেছে।
এই দুর্ঘটনা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। যে ক’জন প্রাণে বেঁচেছেন, তাদের অনেকেই এখন চরম দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে। আর যারা চিরতরে হারিয়ে গেছেন, তাদের স্বজনদের শোকের ভার বইবার মতো নয়।

No comments
ধন্যবাদ।