সিনথিয়া: হঠাৎ দেখি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সদস্যরা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদান ছিল নজিরবিহীন। মিছিলের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে, স্লোগানে উজ্জীবিত করে, নেতৃত্ব দিয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছেন—এই আন্দোলন শুধুমাত্র প্রতিরোধ নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক। সেই উত্তাল সময়ে অন্যতম আলোচিত মুখ হয়ে ওঠেন সিনথিয়া জাহীন আয়েশা, যিনি পরিচিতি পান 'জুলাই কন্যা' নামে।
সিনথিয়া ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি, কিন্তু বিষয়টি নিজের পরিবারের কাছে গোপন রাখেন। কলেজ হল বন্ধ হয়ে গেলেও তিনি বাড়ি না গিয়ে আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকেন বন্ধুদের আশ্রয়ে। দেশকে ভালোবেসে প্রতিদিন মাঠে নামতেন এই বিশ্বাস নিয়ে—আজই হয়তো জীবন দিতে হতে পারে।
ঢাকার বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্রী সিনথিয়া ঢাকাতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ২০২৪ সালের আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সাহসিকতার কাহিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। তিনি জানান, বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। শুরুর দিকে আন্দোলনকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখলেও কিছুদিন পর্যবেক্ষণ শেষে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
সিনথিয়ার স্মৃতিতে গভীরভাবে刻িত হয়ে আছে ১৫ জুলাইয়ের ঘটনা। শেখ হাসিনার বিতর্কিত বক্তব্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যে জমায়েত হয়। সেদিন বিক্ষোভ চলাকালে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র হামলায় সিনথিয়াসহ অনেকেই মারাত্মকভাবে আহত হন। মাথায়, শরীরে রড ও ইটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন তিনি। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় সেসময় অনেকেই নিহত হন বা নিখোঁজ থাকেন। আক্রান্ত হয়েও, নিঃসঙ্গ ও অসুস্থ অবস্থায়, বন্ধুদের সহায়তায় হাসপাতালে পৌঁছান সিনথিয়া।
১৭ জুলাই হল বন্ধের নির্দেশ এলে পরিবার জানতে পারে না তার অবস্থান। তিনি বাড়ি না গিয়ে বন্ধু বা সিনিয়রদের বাসায় আশ্রয় নেন, যাতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারেন। আন্দোলনের দিনগুলোতে প্রতিদিন সকালে বাসা ছেড়ে বের হওয়ার সময় মনে হতো—এই যাত্রা হয়তো শেষ হতে পারে।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও এই অভিজ্ঞতা তীব্র প্রভাব ফেলে তার জীবনে। পরবর্তীতে হঠাৎ অসুস্থতা, অবশতা এবং শ্বাসকষ্টে ভোগেন তিনি, যা ট্রমার ফল বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। যদিও পরামর্শ দেওয়া হয় কাউন্সেলিংয়ের, তিনি কখনো মানসিক চিকিৎসা নেননি।
২৪ জুলাইয়ের পর থেকে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। প্রতিদিন নানা দলের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন, আন্দোলনের পরবর্তী দিকনির্দেশনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
শহীদ মিনারে ৩ আগস্টের জনসমাবেশে উপস্থিত ছিলেন তিনি, যেখানে শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবিতে এক দফা ঘোষণা করা হয়। তার ভাষায়, সেই দিনে উপস্থিত জনস্রোত ছিল এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে মানুষের চোখে-মুখে ছিল আত্মত্যাগের প্রস্তুতি।
সিনথিয়ার মতে, ৯ দফার মধ্যেই এক দফার বীজ রোপিত ছিল—সরকার ক্ষমা চাইলে বা দায় স্বীকার করলে তাকে পদত্যাগ করতেই হতো। তাই এই কৌশলী দাবিসমূহ ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল।
তিনি আরও বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান ছিল গত ১৬ বছরের স্বৈরশাসন, অবিচার ও অসম্মানের বিরুদ্ধে প্রজন্মের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কোটা আন্দোলন ছিল এর সূচনা, কিন্তু এক সময় এটি গণআন্দোলনের রূপ নেয়। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে নতুন নেতৃত্ব, যারা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে নতুন রূপ দিতে পারে।
নারীদের সাহসী ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, নারীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে, বুক পেতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যদিও পরবর্তীতে অনেক নারী আন্দোলন থেকে ছিটকে পড়েছেন, তথাপি তাদের অংশগ্রহণ ইতিহাসে অমলিন থাকবে।
তিনি মনে করেন, এই অভ্যুত্থান সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে—নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক জাগরণ, সংস্কার ও গণতান্ত্রিক চেতনার নবদিগন্ত। তার আশা, এই আত্মত্যাগ এবং সাহসের ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠিত হবে।

No comments
ধন্যবাদ।