স্বৈরাচার পতন: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের গৌরবময় ভূমিকা
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরাচার পতন: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের গৌরবময় ভূমিকা
কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া একটি প্রতিবাদের ঢেউ পরিণত হয়েছিল একদফা স্বৈরাচার পতনের গণআন্দোলনে। এর মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় এক নতুন বাংলাদেশ—যেখানে মানুষের কণ্ঠরোধ নয়, বরং প্রতিবাদের ভাষাই হয়ে ওঠে দেশের দিকনির্দেশক।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন স্বৈরাচারী সরকারের। সারা দেশে যখন আন্দোলনের আগুন জ্বলছিল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ও পিছিয়ে ছিল না। এখানকার ছাত্রছাত্রীরা জীবন বাজি রেখে সংগ্রামে শামিল হয়েছিলেন।
সেই সময়ের অন্যতম ছাত্রনেতা ছিলেন মুহিব্বুল্লাহ মুহিব, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। নাটোর জেলার বড়াইগ্রামের সন্তান মুহিব ছিলেন খানজাহান আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুলনা মহানগরের যুগ্ম সদস্য সচিব।
জুলাই অভ্যুত্থান: স্মৃতিতে এখনও তাজা
বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুহিব বলেন,
“সেই দিনগুলোর কথা এখনও চোখে ভাসে। আশা, ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভরা সময় ছিলো। কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছিল না, বরং অনেকে বলেছিল খুলনা ছেড়ে চলে যেতে। পুলিশি অভিযান এড়াতে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হতো।”
তিনি জানান, কখনও রিকশা করে গা ঢাকা দেওয়া, কখনও অন্যের বাসায় আশ্রয় নেওয়া—এই ছিল জীবনের রুটিন।
“আজও ঘুমের মধ্যে শুনতে পাই—‘কোটা, না মেধা’ স্লোগান। জিরো পয়েন্টে পুলিশের টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ, গুলি সবই এখনও চোখে ভাসে,” বলেন মুহিব।
বিশেষ করে আগস্টের ২ তারিখের সংঘর্ষে পুলিশি হামলার স্মৃতি তাঁর কাছে এখনও বিভীষিকার মতো।
“বিশ্ববিদ্যালয়ের কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা আমাদের ওপর নির্ভর করে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের চোখে আতঙ্ক—‘ভাই, আমরা এখন কীভাবে বাসায় যাব?’ সেই কান্না আজও ভোলার নয়। আমরা অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি,” বলেন তিনি।
কোটা সংস্কার: শুরু ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকেই ক্ষোভ জমতে থাকে।
“কোটার কারণে দেশে মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ৯৮ শতাংশ চাকরি কোটার আওতায় চলে যাচ্ছিল,” বলেন মুহিব।
এ থেকেই শুরু হয় নতুন করে আন্দোলনের পরিকল্পনা।
আন্দোলন থেকে বিপ্লবের পথে
মুহিব বলেন,
“শুরুতে ভাবিনি আন্দোলন সরকারের পতন ঘটাবে। কিন্তু একটা জায়গা এসে মনে হলো—এই সরকারের বিরুদ্ধে যদি কিছু করা যায়, এটাই সুযোগ।”
তিনি বলেন, আন্দোলনের শুরুর দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক।
প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী মিছিলে অংশ নিতো। পরে হল বন্ধ করে দেওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি চলে যায়, তবে আন্দোলনে থেকেছেন অন্যভাবে—মেসে, টিউশনি বা পরিচিতদের বাসায় থেকে।
প্রশাসনের বাধা, ছাত্রলীগের ভয়ভীতি
অত্যাচারও ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।
“পুলিশ খাবারের হোটেল বন্ধ করে দিত, চায়ের দোকানে পর্যন্ত যেতে দিত না। লুঙ্গি পরে বেরোলেও জেরা করত। এই হয়রানি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন,” বলেন মুহিব।
সহিংসতার শুরু: নিরাপত্তার নামে অস্ত্র
“আমরা কখনও আক্রমণ করিনি,” জানান মুহিব।
তবে ছাত্রলীগের হামলার আশঙ্কায় নিজেদের সুরক্ষায় বাঁশ, কাঠ, জিআই পাইপ বহন করতেন আন্দোলনকারীরা।
“শুধু আত্মরক্ষার জন্য—প্রতিরোধের জন্য।”
সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া
খুলনায় সরাসরি সংঘর্ষ না হলেও ছাত্রলীগের হুমকি ছিল ছায়ার মতো।
“২ আগস্ট আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা হয়। ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতার অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামা—এসব দেখে শিক্ষার্থীরা আরও একত্রিত হয়ে উঠে।”
নারী শিক্ষার্থীদের সাহসী অংশগ্রহণ
নারী শিক্ষার্থীরাও ছিলেন আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে।
“তাদের মুখে একটুও ভয় ছিল না। ব্যানার, স্লোগান, অবস্থান—সবকিছুতেই তারা দৃপ্ত ছিলেন,” বলেন মুহিব।
শেষ দিকে তাদের সংখ্যা আরও বেড়ে যায় এবং তারা প্রতিদিনই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
প্রশ্ন: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরাচার পতন আন্দোলন কীভাবে চলমান ছিলো?
মুহিব্বুল্লাহ:
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়—সরকার নিজেই এমন আচরণ করেছিলো, যার ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েছে রুখে দাঁড়াতে। repression বা দমন-পীড়নের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, ততই আন্দোলন আরও ব্যাপকতা পায়। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং সাধারণ ছাত্রদের ওপর নিপীড়ন—এগুলো আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, যৌক্তিক দাবির জন্য আন্দোলন করলেই কেন মার খেতে হবে? এতে আন্দোলন আরও জোরদার হয়।
শুরুতে মূলত শিক্ষার্থীরাই অংশ নেয়, কিন্তু পরবর্তীতে অভিভাবক, শ্রমজীবী, রিকশাওয়ালা, ব্যবসায়ী—সব শ্রেণির মানুষ যুক্ত হতে থাকে। কারণ সবার মনে হচ্ছিল, এটা শুধুই শিক্ষার্থীদের নয়, এটি একটি জনসাধারণের ন্যায্য দাবি।
খুলনায় আন্দোলনের শুরু ও বিস্তার:
খুলনায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয় ৬ জুন, খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি চলছিলো, তাই সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া কঠিন ছিল। তবে ৭ জুন ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করা হয়। এরপর ছুটি শেষে ২৪ জুন থেকে নিয়মিত কর্মসূচি শুরু হয়—মশাল মিছিল, পথসভা, অবস্থান কর্মসূচি, রোড ব্লক ইত্যাদি। আন্দোলনের স্থান ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জিরো পয়েন্ট, সাচিবুনিয়া, শিববাড়ি মোড়—বিভিন্ন পয়েন্টে কর্মসূচি দেওয়া হতো যাতে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ে।
৬ জুলাই শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি হয়, এরপর ৯ জুলাই মোমবাতি প্রজ্বালন এবং ১০ জুলাই বিক্ষোভ। ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার পরে ছাত্রলীগ বিরোধী অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৩০ জুলাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন প্রতিনিধিকে পুলিশের পক্ষ থেকে ডেকে পাঠানো হয়।
সার্কিট হাউজের ঘটনা:
সার্কিট হাউজে নিয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতারা আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন। আমাদের বলা হয়েছিল আলোচনা হবে, কিন্তু সেখানে ঢুকেই বুঝতে পারি এটা একটি প্রি-প্ল্যানড চাপ প্রয়োগের চেষ্টা। আমাদের দাবিকে জামায়াত-শিবিরের ষড়যন্ত্র বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে বলতেই সরকারদলীয় নেতারা অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি শুরু করে। শেষে আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং রাত একটায় সাংবাদিক ডেকে ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়। আমরা অবশ্য বের হওয়ার পরপরই সেটি প্রত্যাহার করি।
পরবর্তী সময়:
৩১ জুলাই সাতরাস্তা মোড়ে পুলিশ আবারো আন্দোলনে হামলা করে, বহু শিক্ষার্থী আটক হয়। ১ আগস্ট কিছুটা স্থবির হলেও ২ আগস্ট আবার নতুনভাবে আন্দোলন জোরদার হয়। ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশ হয়। শেখ হাসিনার ‘পতনের গুজব’ ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনে উত্তেজনা আরও বাড়ে। আওয়ামী লীগ অফিসে আক্রমণের চেষ্টা হয়, যদিও হামলা প্রতিহত করা হয়।
৫ আগস্ট গণউল্লাসের মধ্যে আন্দোলন ঢাকার ‘লং মার্চ’-এর সঙ্গে সংহতি জানিয়ে এগিয়ে যায়। ৬ আগস্ট বিজয় মিছিল হয় খুলনায়।
প্রশ্ন: আন্দোলনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের ভূমিকা কেমন ছিল?
মুহিব্বুল্লাহ:
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা বরাবরই শিক্ষার্থীদের পাশে ছিল। আমি নিজেও তখন চ্যানেল ২৪-এর প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। কোনও সাংবাদিক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ছিল না।
প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা কেমন ছিল?
মুহিব্বুল্লাহ:
পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা ছিল বরাবরই নেতিবাচক। তারা একটিবারের জন্যও জনগণের নয়, বরং সরকারের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। প্রতিনিয়ত আমাদের হুমকি দিত, ভয় দেখাত—‘তোমরা হাসিনা সরকারকে চেনো না? পাঁচ হাজার মানুষকে একসঙ্গে মেরে ফেললে আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে চার ভাগের তিন ভাগ শিক্ষক আমাদের পক্ষে থাকলেও, উপরের মহলের অনেকেই সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। হল বন্ধ করাও ছিল এক ধরনের দমননীতি।
প্রশ্ন: আন্দোলনের সময় আপনি ব্যক্তিগতভাবে কী ধরনের হুমকির মুখে পড়েছিলেন?

No comments
ধন্যবাদ।