Header Ads

Header ADS

“মায়ের কথা এখনো কানে বাজে—তোকে জন্ম দিয়েছি দেশের জন্য”

 

সামিউল আজিম শিশান : “বেঁচে থেকেও যেন মৃতের জীবন নিয়ে আছি”

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ যোদ্ধা সামিউল আজিম শিশান : “বেঁচে থেকেও যেন মৃতের জীবন নিয়ে আছি”

বিশেষ সাক্ষাৎকার : পলিয়ার ওয়াহিদ

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সেই রক্তাক্ত সময়েই সম্মুখ সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থী সামিউল আজিম শিশান। কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক শিশান বর্তমানে বাংলাদেশ গঠনতান্ত্রিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সংগঠক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া সামিউল ২০১৯ সালে যবিপ্রবিতে ভর্তি হয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হন এবং পরবর্তীতে যশোর পৌর সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ধর্ষণবিরোধী প্রতিবাদসহ নানা ন্যায্য দাবির আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন।

তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের মুখোমুখি হন। ১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হাতে হলের একটি রুমে নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়ে সেখান থেকে বহিষ্কৃত হন।

শিশান বলেন, “আবু সাঈদ ও ওয়াসিম আকরাম শহীদ হওয়ার পর আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—হাসিনার পতন।”

“বেঁচে থেকেও যেন মৃতের জীবন…”

বাসস-এর বিশেষ আয়োজন ‘জুলাই জাগরণ’-এ সামিউল আজিম শিশান স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন,

“মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। ভিডিও দেখি, মনে হয় নিজের চোখের সামনে আবার সব ঘটছে। হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। আমি নিজেও মার খেয়েছি, পালিয়ে বেঁচেছি—তবু মনে হয়, আমি বেঁচে নেই।”

যবিপ্রবির অগ্রণী ভূমিকা

“দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আন্দোলনের সূচনা হয় যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। ‘বাংলা ব্লকেড’-এর দিন বড় মিছিল বের করেছিলাম। পুলিশ হামলা করে, কিন্তু তখন মিডিয়া নীরব। তাই যশোরের লড়াই লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়।”

অপ্রকাশিত স্মৃতি

শুরুতে সংগঠন গড়তে গিয়ে নানা বাধার মুখোমুখি হন শিশান।

“মাইক ভাড়া করতে ২০০ টাকাও জোগাড় করতে হিমশিম খেয়েছি। তখন সবাই ঘুমিয়ে থাকত, ডেকে আনতাম হলে হলে গিয়ে। এক ভাই ঘুম ভাঙানোর কারণে গালাগালও করেন। অথচ পরে তাকেই দেখি বড় বড় কথা বলছে!”

তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় শহরের এক বড় ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। কিন্তু প্রতিবেশীর হুমকির কারণে সেখানেও অনিরাপদ হয়ে পড়েন।

ডিজিএফআই-এর হুমকি ও প্রস্তাব

২৮ জুলাই তাঁদের ডেকে নেয় গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই।

“রাশেদ খানকে ফোন করে দেখা করতে বলে। না গেলে সবাইকে তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়। আমরা কয়েকজন যাই। বাইরে থেকে দেখে পরিত্যক্ত বাড়ির মতো, কিন্তু ভেতরে তাদের অফিস। শুরুতে ভালো ব্যবহার করে, পরে আন্দোলন প্রত্যাহার করতে চাপ দেয়, বড় অংকের টাকা অফার করে। আমরা রাজি হইনি।”

পরবর্তীতে সহযোদ্ধারা আশেপাশে জড়ো হলে ডিজিএফআই তাদের ছেড়ে দেয়। সেদিন থেকেই সমন্বয়ক রাশেদ খানের আচরণ সন্দেহজনক হয়ে ওঠে বলে জানান শিশান।

৫ আগস্ট—এক বিপ্লবের সকাল

“আমি তখন চাঁচড়া মোড়ে আন্দোলনে ছিলাম। সহযোদ্ধা জাবের জানায়, হাসিনা পালিয়েছে। মুহূর্তেই মানুষের ঢল নামে রাস্তায়। আমি উত্তেজিত জনতাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করি। সে দিনের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না—এত রক্ত, এত ত্যাগ, আর তবেই পেলাম এই বিজয়।”

শিক্ষকদের ভূমিকা

“আমরা আন্দোলনে যেসব শিক্ষককে পেয়েছি, তাঁদের অবদান কখনো ভুলব না। বিশেষ করে অভিনু কিব্রিয়া স্যার। ১৮ জুলাই তিনি আমাদের রক্ষা না করলে হয়তো আমরা সেদিন গুলিতে ঝরে যেতাম। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাদের শান্ত থাকার অনুরোধ করেছিলেন। জাহাঙ্গীরনগরের রাব্বানী স্যারের সেই কবিতা পাঠও এখনো হৃদয়ে বাজে।”


বাসস: আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে পারিবারিকভাবে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল কি? বাবা-মা কী বলতেন?

সামিউল আজিম: আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। বাবা-মা আমাকে কখনোই থামাতে চাননি। আমি পরিবারের একমাত্র ছেলে—তার পরেও মায়ের একটা কথা আজও মনে পড়ে: “তোকে জন্ম দিয়েছি দেশের জন্য। দেশের প্রয়োজনে যদি জীবন দিতেও হয়, দিবি।” আমার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর কাছ থেকেই আমি দেশপ্রেমের শিক্ষা পেয়েছি। তিনি বলতেন, “আমি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, তুইও নিজেকে দেশের জন্য নিঃশেষ করে দে।”

বাসস: ছাত্রলীগের হামলা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল?

সামিউল আজিম: দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগের নানা অপকর্মে শিক্ষার্থীদের মনে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। তারা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করে চলছিল, হাসিনার রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় লিপ্ত ছিল। যখন তারা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে, সেই ক্ষোভ আর দাবিয়ে রাখা যায়নি। যেন মৌমাছির ছাতা ভেঙে গেছে—হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে।

বাসস: এই আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা কেমন ছিল?

সামিউল আজিম: নারী শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা সত্যিকার অর্থে নেতৃত্ব দিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের থেকেও বেশি সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে যশোরে আমরা সেটা নিজের চোখে দেখেছি—যখন পুলিশ আমাদের দিকে এগিয়ে আসে, তখন নারী শিক্ষার্থীরা আমাদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। এটা ইতিহাসে জেন্ডার সমতার এক অনন্য উদাহরণ। তবে দুঃখজনকভাবে, আন্দোলনের পর আমরা তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারিনি।

বাসস: প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখেছেন?

সামিউল আজিম: এই প্রশ্নে বলার মতো কিছু নেই—কারণ পুলিশ ছিল একেবারে হাসিনার অধীনস্ত পেটুয়া বাহিনী। তারা যেভাবে দেশের মানুষ, শিক্ষার্থী, তরুণদের ওপর হামলা করেছে, তা ক্ষমার অযোগ্য। তারা যেভাবে রক্তপাত ঘটিয়েছে, তার বিচার আজও হয়নি। আমার মনে হয়, পুলিশ বাহিনীকে ‘ডেথ ডিক্লেয়ার’ করে নতুনভাবে গড়ে তোলা দরকার ছিল। যেসব পুলিশ শিক্ষার্থীদের গুলি করেছে, তাদের মনোজগতে তো নৈতিকতা বলে কিছু নেই। ঢাকা, খুলনা, বরিশাল—সব জায়গায় তারা গুলি করেছে। সেই রক্ত এখনো শুকায়নি, অথচ আবারও লাঠিচার্জ? যারা অপরাধী নয়, তাদের আমি কখনো হেনস্থা করার পক্ষে নই, কিন্তু যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছে, তাদের বিচার না করে আপনি কাকে বিচার করবেন?

বাসস: আন্দোলনের সময় আপনি ব্যক্তিগতভাবে কী ধরনের হুমকির মুখে পড়েছিলেন?

সামিউল আজিম: আমি সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম ব্যক্তি, যাকে আন্দোলনের কারণে ছাত্রলীগ রুমে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে। ১৫ জুলাইয়ের সেই রাত আমার জীবনে ভয়াবহ এক দাগ কেটে গেছে। পরবর্তীতে নানা জায়গা থেকে হত্যার হুমকি পেয়েছি। ডিজিএফআই-ও আমাকে অফিসে ডেকে আন্দোলন থেকে সরে আসার জন্য হুমকি দিয়েছিল।

বাসস: আন্দোলনে আহত এবং শহীদদের জন্য আপনারা কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন?

সামিউল আজিম: আমরা চেষ্টার কোনো কমতি রাখিনি। হাসপাতালগুলোতে গিয়ে বলেছি—জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা যেন বিনামূল্যে করা হয়। যশোরসহ অনেক স্থানে আবেদন করেছি, যাতে তাঁদের কাছ থেকে কোনো ফি না নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গেই আমরা যোগাযোগ করেছি।

বাসস: এই গণঅভ্যুত্থানের পর আপনি নতুন বাংলাদেশের কী স্বপ্ন দেখেন?

সামিউল আজিম: আমাদের একটাই প্রত্যাশা—একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। একটি এমন রাষ্ট্র, যেখানে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহিতার মধ্যে থাকবে, রাষ্ট্র হবে জনগণের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুলিশের মতো মৌলিক খাতে যে সংস্কার প্রয়োজন, তা যেন আর অবহেলিত না থাকে। এই পরিবর্তনের জন্যই তো আমাদের ভাইয়েরা রক্ত দিয়েছে। 

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.