জুলাই সনদ
জুলাই সনদ: দফায় দফায় সংলাপেও চূড়ান্ত হয়নি ঐতিহাসিক ঘোষণা, অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ রূপরেখা
দফায় দফায় মতবিনিময়ের পরও বহুল প্রতীক্ষিত 'জুলাই সনদ' এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভ্যুত্থান-পূর্ব আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হলেও, সনদের ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থেকেই যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—‘জুলাই সনদ’ আদৌ কত দূর?
জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে টানা ১৬ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর জাতির সামনে নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে এক অভাবনীয় ঐক্যের ভিত্তিতে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠিত হয় ১১টি কমিশন। ঘোষিত হয়, এসব কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হবে একটি ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত আর অনৈক্যের কারণে এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।
ভিন্নমতের জটিলতা
কমিশনের ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে অন্তত অর্ধেক বিষয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও ঐকমত্য হয়নি। বিশেষ করে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিতকরণ, সংসদের উচ্চকক্ষ, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) এবং ৭০নং অনুচ্ছেদের সংশোধন—এসব ইস্যুতে দলগুলোর অবস্থান স্পষ্টভাবে পরস্পরবিরোধী।
বিএনপি ও তাদের মিত্ররা এনসিসি গঠন এবং সংসদের উচ্চকক্ষে ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টনের বিরোধিতা করেছে। তারা মনে করে, এসব পরিবর্তন রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করবে। বিপরীতে এনসিপির মতো দলগুলো এই বিরোধিতাকে ফ্যাসিবাদী কাঠামোতে আটকে থাকার মানসিকতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
সংলাপে ক্ষোভ ও সংকট
ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিরোধ ও সন্দেহের ছাপ স্পষ্ট। দলগুলো আসনবিন্যাস, কথার সুযোগ, এমনকি নিবন্ধনহীন দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়েও আপত্তি তুলেছে। জামায়াতে ইসলামীর সংলাপ বয়কট এবং পরে ফিরে আসা, আবার একই কারণে সিপিবি, গণফোরাম, এলডিপির অংশ বয়কট—এসবই জানান দিচ্ছে একটি গভীর আস্থার সংকট।
সময়সীমা পেরিয়ে গেছে
গত ১০ মে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে ২৫ জুন। পরে জানানো হয়, জুলাই মাসের মধ্যেই সনদ প্রকাশ করা হবে। আবু সাঈদের মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে তা ঘোষণা করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে এখনও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
দলগুলোর অবস্থান
- বিএনপি: সনদে আগ্রহ থাকলেও বিষয়বস্তু না দেখে সই করবে না।
- জামায়াতে ইসলামী: জুলাই মাসেই সনদ চূড়ান্ত করার পক্ষে। তবে রাষ্ট্র কাঠামোর বিষয়ে দলগুলো একমত না হওয়ায় হতাশ।
- এনসিপি: সরকার ব্যর্থ হলে ৩ আগস্ট নিজেরাই ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ প্রকাশ করবে।
- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: সনদের মাধ্যমে একদলীয় শাসনের পথ রোধ করতে চায়।
- এবি পার্টি: ‘জুলাই সনদ’ একটি প্রতিশ্রুতি; এটি না হওয়া অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
- বাংলাদেশ জাতীয় দল: কমিশন অনেক বিষয় চাপিয়ে দিতে চাইছে; তবে আশাবাদী যে জুলাইয়ের মধ্যেই সনদে স্বাক্ষর হবে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, “জুলাই সনদ শুধু একটি রাজনৈতিক চুক্তি নয়, এটি ভবিষ্যতের রাষ্ট্র কাঠামোর একটি দিকনির্দেশনা। সবার চাওয়া–জুলাই মাসেই এটি চূড়ান্ত হোক। তবে দেরি হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।”
‘জুলাই সনদ’ এখন শুধু একটি ঘোষণার নাম নয়—এটি একটি জাতির আকাঙ্ক্ষা, পরিবর্তনের স্বপ্ন এবং রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যদি মতানৈক্য, সংশয় এবং দৃষ্টি ভঙ্গির ব্যবধান দূর না করা যায়, তবে এই প্রতিশ্রুত পরিবর্তনের স্বপ্নও হারিয়ে যেতে পারে রাজনৈতিক বাস্তবতার ধোঁয়াশায়।

No comments
ধন্যবাদ।