‘বিজয়ের মিছিলে’ গিয়েছিলেন জুয়েল
স্ত্রীকে ঘুমে রেখে ‘বিজয়ের মিছিলে’ গিয়েছিলেন জুয়েল, ফিরলেন শহীদের মরদেহ হয়ে
৫ আগস্ট ২০২৫। গার্মেন্টসকর্মী মো. জুয়েল রানা স্ত্রীকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে বের হয়ে যান ‘ফ্যাসিস্ট সরকার’ পতনের বিজয় মিছিলে। গাজীপুরের আনসার একাডেমির সামনে অনুষ্ঠিত সেই মিছিলে অংশ নিয়ে শহীদ হন ২৭ বছর বয়সী এই যুবক।
জুয়েলের জন্ম ১৯৯৭ সালের ৯ জুলাই, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শালমারা ইউনিয়নের শাখাহাতি (বালুয়া) গ্রামে, এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। বাবা মোনতাজ উদ্দিন ব্যাপারী (৫৫), মা মোছাম্মৎ জমেলা খাতুন (৪২)। জীবিকার তাগিদে ছোটবেলাতেই পড়ালেখা ছেড়ে শ্রমের জগতে পা রাখেন জুয়েল।
পারিবারিক জীবন ও সংগ্রাম
জুয়েল পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন একই উপজেলার বারপাইকা গ্রামের দুলালি আক্তারকে (২৩)। তাদের দুটি কন্যাসন্তান—জান্তা আক্তার জুঁই (৯), যিনি গাজীপুরের একটি হেফজ মাদ্রাসায় আবাসিক পড়াশোনা করেন, এবং ছোট মেয়ে জিম আক্তার জিনাত (৬), থাকেন নানির কাছে।
দুলালি ও জুয়েল দুজনেই গার্মেন্টসে কাজ করতেন—জুয়েল ছিলেন গাজীপুরের ইন্টারস্টোপ গার্মেন্টসে সুইং অপারেটর, দুলালি কাজ করতেন ইকো টেক্স গার্মেন্টসে। তারা পরিবার নিয়ে গাজীপুরের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
শেষ দিনের স্মৃতি
জুয়েলের স্ত্রী দুলালি বলেন,
“সকাল ১১টার দিকে একসাথে খাওয়া শেষে আমি বলেছিলাম, আন্দোলনে না যেতে। সে বলল, ‘আমার মেয়েরা বড় হলে বলবে, তুমি কী করছিলে তখন?’ তারপর ঘুমাতে যাই। দুপুর ১২টার পর সে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে মিছিলে যায়। বিকেল ৩টার দিকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর আসে।”
জুয়েলকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। দুলালি বলেন,
“সে শুধু স্বামী না, আমার সব ছিল। বিদেশ থেকেও শুধু আমার জন্য ফিরে এসেছিল। প্রতি বৃহস্পতিবার মাংস কিনে নিজে রান্না করত, খিচুড়ি তার প্রিয় ছিল। আমাকে বাজারে নিয়ে যেত, সুখেই সংসার করছিলাম আমরা।”
শহীদ হওয়ার পটভূমি
শহীদের বড় জেঠা মোফাজ্জল হোসেন জানান,
“৪ আগস্ট চন্দ্রায় মিছিলে মাথায় আঘাত পেয়ে ৬টা সেলাই লাগে। পরদিন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর শুনে মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়েই আবার মিছিলে যায়। আনসার একাডেমির সামনে সে তলপেটে গুলিবিদ্ধ হয়। হাসপাতাল নিতে গিয়ে সময় লাগে, কিন্তু রক্ত দেয়ার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায়।”
অন্তিম যাত্রা ও পরিবার
জুয়েলের মরদেহ ৬ আগস্ট সকাল ১১টায় জানাজা শেষে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন জুয়েল। বড় বোন মনজিল বেগম (৩০) পলাশবাড়ীতে বিবাহিত, মেজ ভাই জসিম (২৯) গার্মেন্টস শ্রমিক, যিনি দুই সন্তানের পিতা।
জুয়েল ভাগ্য ফেরাতে লিবিয়ায়ও গিয়েছিলেন, তবে বেশিদিন থাকতে পারেননি। ২০২৪ সালে ধারদেনা করে দেশে ফেরেন। প্রথমে গ্রামে বিভিন্ন কাজ করে জীবন চালালেও পরে আবার গার্মেন্টসে যোগ দেন।
পরিবারে শোক, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
মা জমেলা খাতুন বলেন,
“হামার জুয়েল সবার আদরের আছিল, নম্র-ভদ্র আছিল। কামাইয়ের জন্য ক্লাস ছয়ে পড়া বন্ধ কইরা বাইর হইছিল, আর লাশ হইয়া ফিরল।”
দুলালি বলেন,
“আমার পড়ালেখা নাই, এখনো গার্মেন্টসেই কাজ করতে হয়। সরকার যদি একটা স্থায়ী চাকরি দিত, তাহলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ অন্তত নিশ্চিত হতো।”
আর্থিক সহায়তা
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন জুয়েলের স্ত্রীকে ৪ লাখ ও মাকে ১ লাখ টাকা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামি স্ত্রী ও মাকে ১ লাখ টাকা করে এবং বিএনপি ১ লাখ টাকা দিয়েছে। জেলা পরিষদ থেকেও শহীদের মাকে ২ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
শহীদ জুয়েল রানা, এক গার্মেন্টস শ্রমিকের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠেছিলেন—এক সংগ্রামী পিতা, এক অনড় কর্মী, আর এক তরুণ যিনি নিজের রক্ত দিয়ে ইতিহাসে নিজের নাম লিখে গেলেন।

No comments
ধন্যবাদ।