Header Ads

Header ADS

গণঅভ্যুত্থানের ফিরে দেখা ৯ জুলাই

'বাংলা ব্লকেড'

৯ জুলাই ২০২৪: 'বাংলা ব্লকেড'-এর ডাক ও উত্তাল রাজপথ

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক পালাবদলের সময় ২০২৪ সালের জুলাই। এই মাসে গড়ে ওঠা ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুধু একটি দাবি নয়, একটি যুগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল—বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্য।
তারই ধারাবাহিকতায় ৯ জুলাই ২০২৪ হয়ে ওঠে আরেকটি মোড় ঘোরানো দিন।

সর্বাত্মক 'বাংলা ব্লকেড'-এর ঘোষণা

এই দিন বিকেল ৬টায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়—১০ জুলাই সকাল ১০টা থেকে সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে ‘বাংলা ব্লকেড’ পালন করা হবে।
আন্দোলনের সময়সীমা বাড়িয়ে ঘোষণা করা হয় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি।

নেতৃত্বের অবস্থান

সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন:

“আমরা জানি, এই আন্দোলনের ফলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে, এবং আমরাও এই ভোগান্তি চাই না। কিন্তু এর জন্য দায়ী সরকার। কোটা-সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের ও নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের এখতিয়ার রয়েছে, অথচ তারা নিরব।”

আরেক নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ স্পষ্ট করে বলেন:

“আমাদের দাবি কোটা বাতিল নয়, বরং ন্যায্যতার ভিত্তিতে এর সংস্কার। আমরা মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলছি না। তবে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের জন্য কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করছি, কারণ তা বৈষম্যমূলক।”

এর আগেই ৮ জুলাই এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন সমন্বয়ক সারজিস আলম

 সড়কে প্রতিরোধ, আদালতে আবেদন

৯ জুলাই সকাল থেকেই রাজপথে টানটান উত্তেজনা

  • ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রতীকী অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) অনুষ্ঠিত হয় অবস্থান কর্মসূচি।
  • রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা চার ঘণ্টার সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনের শক্তি জানান দেন।

এদিন রাজপথের বাইরে, হাইকোর্টে রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করেন দুই শিক্ষার্থী। যদিও আন্দোলনের সংগঠকরা জানান, এই আবেদন আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ।

 সরকারের অবস্থান ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা

তৎকালীন সরকারের আইনমন্ত্রী বলেন,

“এটি আদালতের বিষয়। রাজপথে আন্দোলন করে এর সমাধান হবে না।”

একইসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল এ আন্দোলনকে রাজনৈতিক রং দেওয়ারও চেষ্টা করেন। তবে আন্দোলনকারীরা তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং দাবি করেন—সরকারের নীরবতা ও অসাড়তাই এ প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে।

৯ জুলাই ২০২৪: আন্দোলনের গতি বাড়ায় শিক্ষার্থীরা, বুয়েটের সরব অংশগ্রহণ ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান

জুলাই মাসের প্রতিটি দিনই যেন রচিত হচ্ছিল ছাত্র-জনতার রক্ত, ঘাম ও অদম্য প্রত্যয়ে। ৯ জুলাই ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের নবম দিন। এই দিন আন্দোলনের কৌশলে আসে নতুন মোড়—ঘোষণা করা হয় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি, যার মাধ্যমে আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও চাপ দুটোই এক ধাপে বাড়ে।

সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের নতুন ধারা

এই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর পক্ষ থেকে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে:

  1. ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির সময়সীমা বাড়িয়ে সকাল-সন্ধ্যা পর্যন্ত সম্প্রসারণ।
  2. সড়কের পাশাপাশি রেলপথ অবরোধের ডাক।

শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন—তাদের দাবি আদালতের নয়, সরকারের নির্বাহী বিভাগের বিষয়। সেই দাবি বাস্তবায়নে একটি স্বাধীন ‘কোটা সংস্কার কমিশন’ গঠনের আহ্বান জানান তারা।

বুয়েটের প্রথম সরব অংশগ্রহণ: “প্রশ্ন যখন মেধার, চুপ থাকা চলে না”

এতদিন সরাসরি আন্দোলনে অংশ না নেওয়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরাও ৯ জুলাই মাঠে নামেন।
তারা ক্যাম্পাসে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে মানববন্ধন করেন এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন। বুয়েটের এই অংশগ্রহণ আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিস্তার আরও জোরালো করে তোলে।

 আদালতকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

এই দিন ঢাবির দুই শিক্ষার্থী হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন, যা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের রায় স্থগিত চাওয়া সংক্রান্ত।
তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে দ্রুত জানিয়ে দেওয়া হয়—এই দুই শিক্ষার্থী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং এই আপিল আন্দোলনের প্রকৃত দাবির বিপরীতমুখী
আন্দোলনকারীরা একে সরকারের ‘প্রশাসনিক নাটক’ বা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ওই আপিলের প্রতি সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, "সঠিক সিদ্ধান্ত সময়মতো এসেছে।"
আন্দোলনকারীদের মতে, সরকারের এমন প্রতিক্রিয়া আন্দোলনকে বিভ্রান্ত ও ভাঙার কৌশলমাত্র।

 পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও উত্তপ্ত পরিবেশ

৯ জুলাই শাহবাগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির বিরুদ্ধে পাল্টা অবস্থান নেয় ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবার’ নামের একটি সংগঠন।
তারা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে এবং ঘোষণা দেয়—কোটা আন্দোলন প্রত্যাহার না করা হলে তারা কঠোর কর্মসূচিতে যাবে।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে শাহবাগ ও আশপাশের এলাকাজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ

এই দিন শুধু রাজধানী নয়, বরিশাল, হবিগঞ্জ, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও চলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ।
রাজপথে দৃপ্ত কণ্ঠে ওঠে স্লোগান—“বৈষম্যের কোটা মানি না”, “আমার মেধা আমার অধিকার”, “সংবিধান মানো, কোটা হটাও।”

চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর

নবম দিনে এসে আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি যেমন ঘন হচ্ছে, তেমনি সরকারবিরোধী জনমতও স্পষ্ট হয়ে উঠছে
নেতৃত্বের ঐক্য, নতুন সংহতি (যেমন বুয়েট), এবং সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে ৯ জুলাই একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে ওঠে।

এই দিনের কার্যক্রমই পরদিন ১০ জুলাইয়ের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচির ভিত্তি স্থাপন করে।

৯ জুলাইয়ের ঘটনাবলি প্রমাণ করে—জুলাই আন্দোলন ছিল সুসংগঠিত, প্রভাবশালী ও ব্যাপক গণসমর্থনসম্পন্ন। রাজপথ, আদালত ও সংবাদমাধ্যম—সব জায়গাতেই ছিল এর সাড়া।
এই দিনটির মধ্যে দিয়ে 'বাংলা ব্লকেড' পেয়েছিল এক নতুন মাত্রা, আর ইতিহাসে যুক্ত হয়েছিল জুলাই গণআন্দোলনের এক স্মরণীয় অধ্যায়।

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.