নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন ছিল তাঁর
নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন ছিল তাঁর—নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানে ঘর বাঁধার প্রস্তুতিও চলছিল জোরেশোরে। কিন্তু সবকিছুই শেষ হয়ে গেল হঠাৎ এক রক্তাক্ত বিকেলে। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার রাজপথে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তরুণ প্রকৌশলী সুজন মাহমুদ। এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের এমন করুণ পরিণতি হয়ে উঠেছে এই সময়ের নির্মম এক প্রতিচ্ছবি।
স্বৈরাচার পতনের পর রাজপথ যখন উল্লাসে মুখর, জনগণের বিজয়ের ঢেউ যখন সর্বত্র, তখনই সেই উৎসব থেমে যায় শাসকের নির্দেশে চালানো বুলেটের মুখে। নিঃসঙ্গ এক স্বপ্নবাজ প্রাণ থেমে যায় মিরপুরের রাস্তায়—যার কিছুদিন পরই ছিল বিয়ের দিন, যার সামনে ছিল নতুন জীবনের দ্বার। কিন্তু সেই দিন আর এল না। ফুলশয্যার জায়গা হলো কবরের নিস্তব্ধতা।
শহীদ সুজন মাহমুদের মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি সচেতন প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের দলিল—একটি আত্মত্যাগের কাহিনি, যা হার মানায় শত বেদনার গল্পকেও।
সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার রূপপুর নতুনপাড়ার সন্তান সুজন মাহমুদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯১ সালের ৩০ জুন। বাবা আলহাজ্ব আবদুর রশিদ মাস্টার ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন সুজন। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে কিছুদিন চাকরির পর গড়ে তুলেছিলেন নিজের প্রতিষ্ঠান—‘ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি বিডি’, যেখানে তিনি অনলাইনে ইলেকট্রনিক্স পণ্য বিক্রি করতেন। রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বরে থাকতেন ভাড়া বাসায়।
২০২৪ সালের কোরবানির ঈদে বাড়ি এসে পরিবারের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়ে আবার ঢাকায় ফেরেন। তারপর একদিন, ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় মিরপুরে বিজয় মিছিলে অংশ নেন। সেখানেই পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। তার ঘাড়ে গুলি লাগে। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে, পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সুজনের বড় বোন রাবেয়া খাতুন বলেন, “হয়তো শেষবারের মতো কথা বলতেই সে আমাকে ফোন করেছিল। আমি বলেছিলাম, আজ মিছিলে যেও না। সে বলেছিল, ‘ভয় নেই, শেখ হাসিনা তো পালিয়ে গেছে, পুলিশ গুলি করবে না।’ কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর ওর বন্ধুরা জানায়—সুজন আর নেই।”
শোকস্তব্ধ মা শামছুন্নাহার বেগম বলেন, “আমার সন্তানকে ফেরত দাও। সে তো কোনো অন্যায় করেনি। কেন গুলি করা হলো তাকে? সে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই।”
সুজনের মরদেহ রাত আড়াইটার দিকে নিজ গ্রামে পৌঁছায়। ৬ আগস্ট সকাল ৯টায় বাদলবাড়ি শাহ হাবিবুল্লাহ (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয় হাবিবুল্লাহ ইয়েমেনি কবরস্থানে।
মেজ ভাই সুলতান মাহমুদ বলেন, “সুজন দেশপ্রেমিক ছিল। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে সে আন্দোলনে গিয়েছিল। তার মৃত্যু আমাদের ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু মাথা নত করেনি।”
পরিবারের সদস্যরা জানান, জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আরও দুই লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও ইউএনও-ও ঈদের আগে তাদের খোঁজ নিয়েছেন।
সুজন মাহমুদের শহীদ হওয়ার পর, ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সিএমএম কোর্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বাদী ছিলেন শহীদ সুজনের ভাই সুলতান মাহমুদ।
আজ শহীদ সুজন মাহমুদের কথা বলতে গেলে শুধু একজন যুবকের মৃত্যু নয়, দেখতে হয় একটি পুরো প্রজন্মের বিসর্জন—যেখানে ব্যক্তিগত স্বপ্ন আর জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা মিশে গেছে রক্তে রাঙানো ইতিহাসে।

No comments
ধন্যবাদ।