নিজামের শহরে বাংলাদেশের জয়
হায়দরাবাদ, ১৯৯৮: এক রূপকথার শুরু
১৯৮৬ সালে ওয়ানডেতে পথচলার শুরু। এরপর অনেক হার, অনেক চেষ্টা। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ১৭ মে, হায়দরাবাদের লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে এসেছিল সেই বহু কাঙ্ক্ষিত জয়। কেনিয়ার বিপক্ষে ৬ উইকেটের জয়। বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম সাফল্য।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেটি হয়তো খুব ছোট মনে হতে পারে—এখন তো বাংলাদেশ নিয়মিত জেতে, সিরিজ জেতে, বিশ্বমঞ্চেও লড়াই করে। কিন্তু তখন? একটি জয়ই ছিল স্বপ্নের মতো। কারণ, সেটাই ছিল প্রথম। আর ‘প্রথম’-এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অন্য রকম এক আবেগ, এক উত্তেজনা, এক গর্ব।
সে ম্যাচের নায়ক মোহাম্মদ রফিক—বাঁহাতি স্পিনে ৩ উইকেট নেওয়ার পর ওপেনিংয়ে নেমে খেলেছিলেন ঝড়ো ৭৭ রানের ইনিংস। তিনিই গড়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জয়গাথার ভিত।
আমি ছিলাম সেই ম্যাচ কাভার করতে আসা ক্রীড়া সাংবাদিকদের একজন। গর্বের কথা, বাংলাদেশ ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই—টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি—প্রথম জয়ের সাক্ষী হয়েছি প্রেসবক্সে বসে। সেই অনুভূতিই আবার জাগিয়ে দিলেন উৎপল শুভ্র, যখন বললেন, “প্রথম ওয়ানডে জয়ের দুই যুগ পূর্তিতে কিছু একটা লেখো।”
‘আন্ডারডগ’ ট্যাগ গায়ে নিয়েই মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ
তখনকার বাংলাদেশ দলকে বলা হতো ‘আন্ডারডগ’। ওই ত্রিদেশীয় সিরিজে স্বাগতিক ভারতের সঙ্গে ছিল কেনিয়া, যারা এর আগেই বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল। ভারতকেও হারায় তারা। সেই কেনিয়ার বিপক্ষে জয়টা তাই আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, যখন কেনিয়ান ক্রিকেট প্রায় বিস্মৃত, বাংলাদেশের ক্রিকেট তখন রোজ ইতিহাস লিখছে। কিন্তু ১৯৯৮ সালের সেই জয়ের গুরুত্ব একটুও কমেনি। কারণ, ওটাই ছিল শূন্য থেকে একে পৌঁছানোর মুহূর্ত।
উল্লাস, আত্মবিশ্বাস আর কাঁপতে থাকা লবি
ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে বাঁধভাঙা উল্লাস—সেই স্মৃতি এখনো চোখে ভাসে। সাংবাদিক হিসেবে তখনকার মতো এখনকার কড়াকড়ি ছিল না। আমরা সবাই সেই জয়োৎসবে মিশে গিয়েছিলাম।
হোটেলে ফিরে দেখা গেল, “বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!” স্লোগানে কাঁপছে বানজারাহিলের তাজ হোটেলের লবি। বলিউডের অনিল কাপুর, মাধুরী দীক্ষিতরাও নেমে এলেন অভিনন্দন জানাতে। তখন তো আর মোবাইল ক্যামেরার যুগ ছিল না, কিন্তু তারকাদের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি উঠিয়েছিলেন খালেদ মাসুদ, শান্ত, সুমনরা।
রাতভর গান, সকালবেলার শিরোনাম
রাতটা ছিল অন্যরকম। আবেগে এতটাই ভেসে গিয়েছিলাম যে রিপোর্ট লেখার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। গর্ডন গ্রিনিজ, যার গাম্ভীর্য বিখ্যাত, সেও সারা রাত জেগে ভোরের আলোয় গলা মিলিয়েছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলা…’। এমন এক মুহূর্ত, যেখানে ক্রিকেট আর সংস্কৃতি মিশে তৈরি করেছিল অনন্য এক ইতিহাস।
শেষ কথা
হয়তো সেই জয়ের আনন্দ এখনকার তরুণ প্রজন্মের কল্পনায় ধরা পড়ে না। তবে সেটাই ছিল ভিত্তি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের রূপান্তরের প্রথম পাথর। আর ইতিহাসের পাতায় সেই জয় থাকবে চিরকাল—একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের সূচনা হিসেবে।

No comments
ধন্যবাদ।