উত্তরবঙ্গের প্রাচীন স্থাপত্য আর নিদর্শনের খোঁজ
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে আমি ঘুরে এলাম রাজশাহী। রাজশাহী জাদুঘরটি দেখে মনে হলো, এটি শুধু বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর হিসেবে নয়, বরং প্রত্নসম্পদ ও ঐতিহ্যের দিক দিয়েও অন্যতম শ্রেষ্ঠ। এর পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রাজশাহীর ইতিহাস বহু প্রাচীন। একসময় এই অঞ্চল রেশম চাষের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত ছিল। আঠারো শতকে এই অঞ্চলে রেশম ব্যবসায় আসেন ওলন্দাজরা। এখনো শহরে এবং কাছের সারদা পুলিশ একাডেমিতে কিছু ডাচ স্থাপত্যের নিদর্শন দেখা যায়। একইভাবে দেখা যায় ফরাসি ও ইংরেজ নীলকুঠির ভবন। মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনন্য উদাহরণ বাঘা মসজিদ, পুঠিয়া রাজবাড়ি, সব মিলিয়ে এক গভীর ঐতিহ্যের সাক্ষী। পাশাপাশি নগরীর পুরোনো খ্রিষ্টান সমাধিভূমিও চোখে পড়ার মতো।
রাজশাহীর মতোই উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলা ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। আমার চোখে, গোটা উত্তরবঙ্গই বাংলাদেশের ‘হেরিটেজ জোন’। এখানে রয়েছে প্রাচীন নগরী, শত বছরের উপাসনালয়, পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জমিদার ও শাসকদের নির্মিত স্থাপনা।
ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম সূর্যপুরী আমগাছের দিকে, যা প্রায় দুই বিঘা জমিজুড়ে বিস্তৃত। একই জেলার রানীশংকৈলের গোরকুই গ্রামের বেলেপাথরের কূপ, ছোটবালিয়া ও শালবাড়ি মসজিদ, ইমামবাড়া, জামালপুর ও হরিপুর জমিদারবাড়ি, রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি ও হরিণমারী শিবমন্দির ঐতিহ্যের নিদর্শন বহন করে।
সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের গোলকধাম মন্দির দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এ জেলার আটোয়ারীতে রয়েছে মির্জাপুর জামে মসজিদ, যা মোগল স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন।
দিনাজপুর জেলার কথা বললেই মনে পড়ে কান্তজিউর মন্দির ও রামসাগরের কথা। কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে সতীমন ডাঙ্গী, যেখানে একটি বিরল বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। সীতাকোট বিহার খ্রিস্টীয় পাঁচ শতকে নির্মিত বৌদ্ধবিহার, যা দেশের প্রাচীনতমগুলোর একটি।
রংপুরে ঘুরতে গিয়ে তাজহাট জমিদারবাড়ি ও মন্থনা জমিদারবাড়ি চোখে পড়ার মতো। নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের পায়রাবন্দ গ্রামের স্মৃতিচিহ্নগুলো ইতিহাস সচেতন ভ্রমণকারীদের আবেগে ভরিয়ে দেবে। শতবর্ষী কারমাইকেল কলেজ এখানকার আরেকটি আকর্ষণ।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে ইংরেজদের গড়ে তোলা রেলওয়ে কারখানা এবং ইউরোপিয়ান ক্লাবের ভবন আজো ইতিহাসের সাক্ষী। কুড়িগ্রাম ভাওয়াইয়া গান ও নদ-নদীতে ভরপুর। শহরের জাহাজবাড়ি, পরিত্যক্ত পুরোনো ভবন আর রেলস্টেশন একধরনের নস্টালজিয়া জাগায়।
লালমনিরহাটে শত বছরের পুরোনো রেলস্টেশনের কাঠের সিঁড়ি আর গাইবান্ধার বোগদহ বৌদ্ধবিহার (ঢিবি), বিরাট নগরের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলো রীতিমতো বিস্ময় জাগায়।
জয়পুরহাটের খঞ্জরপুর রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও পাঁচবিবির লকমা জমিদারবাড়ি, নওগাঁর পাহাড়পুর মহাবিহার, জগদ্দল ও হলুদ বিহার, কুসুম্বা মসজিদ, মাহিসন্তোষ দুর্গ এবং আলতা ও দিবর দিঘি উত্তরবঙ্গের প্রত্নঐতিহ্যের জ্বলন্ত প্রমাণ।
বগুড়ায় পুণ্ড্রনগরী মহাস্থানগড় ও ভাসু বিহার প্রাচীন বাংলার গৌরবময় অতীতের দর্পণ। ভাসু বিহার ছিল ত্রিতল বা চর্তল বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে সাত শতাধিক বৌদ্ধ পণ্ডিত শিক্ষালাভ করতেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছোট সোনা মসজিদ, দারাস বাড়ি মাদ্রাসা, শাহ নেয়ামত উল্লাহর মাজার, তিন গম্বুজ মসজিদসহ বহু স্থাপত্য নিদর্শন আছে, যেগুলো সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নজির।
নাটোরের কাঁচাগোল্লা, রানি ভবানী ও উত্তরা গণভবনের নাম সব পর্যটকের কাছেই পরিচিত। পাবনার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও হান্ডিয়াল মন্দির প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো ইতিহাস বহন করে।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি আর হাটিকুমরুলের নবরত্ন মন্দিরও ঐতিহ্যের গৌরব বহন করে।
এইসব স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের কারণে উত্তরবঙ্গকে যদি 'বাংলাদেশের হেরিটেজ জোন' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তবে খুব দ্রুতই বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে এই অঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেবে।

No comments
ধন্যবাদ।