বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত
বিয়ে নারী-পুরুষের মাঝে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও শ্রদ্ধার এক পবিত্র বন্ধন—আর এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দেনমোহর। এটি ইসলামে নারীর প্রাপ্য অধিকার এবং স্বামীর ওপর অপরিহার্য দায়িত্ব।
দেনমোহর কী?
দেনমোহর হলো—স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদানযোগ্য একটি নির্দিষ্ট অর্থ বা সম্পদ, যা বিয়ের সময় চুক্তিভিত্তিক নির্ধারণ করা হয়। এটি ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী নারীর ন্যায্য অধিকার।
ইসলামের দৃষ্টিতে দেনমোহরের গুরুত্ব:
- এটি শুধু একটি প্রতীকী অঙ্ক নয়; বরং পরিশোধযোগ্য বাস্তব দায়।
- পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে:
দেনমোহরের বৈশিষ্ট্য:
-
স্ত্রীর অধিকার: দেনমোহর স্ত্রীকে সম্পূর্ণভাবে প্রদান করতে হবে—চাইলেই ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু চাপ সৃষ্টি করা চলবে না।
-
পরিশোধ বাধ্যতামূলক: অনেকেই কেবল নামমাত্র অঙ্ক লিখিয়ে দেন, কিন্তু তা কখনো পরিশোধ করেন না—এটি ইসলামের বিধান অনুযায়ী সঠিক নয়।
-
পরিমাণ নির্ধারণে নমনীয়তা: ইসলামে দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণে বাধ্যবাধকতা নেই—অর্থনৈতিক সামর্থ্য অনুযায়ী তা নির্ধারিত হতে পারে।
সামাজিক বাস্তবতায় গুরুত্ব:
দেনমোহর নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি প্রতীক। এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং নারীর মর্যাদা, সম্মান ও অধিকার স্বীকৃতির একটি রূপ।
সারসংক্ষেপে, বিয়ে যেমন ভালোবাসার বন্ধন, তেমনি দেনমোহর নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ইসলামী দায়িত্ব পালনের প্রকাশ। এটি শুধু চুক্তির কাগজে নয়, বাস্তব অর্থে পরিশোধ করাই হলো প্রকৃত ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিফলন।
বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ:
ফুকাহায়ে কেরাম (ইসলামী ফিকহবিদগণ) বলেন, বিয়ে বৈধ ও শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ আবশ্যক:
-
ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) – পাত্র ও পাত্রীর পক্ষ থেকে বা অভিভাবকদের মাধ্যমে প্রকাশ্যে হতে হবে।
-
সাক্ষী উপস্থিতি – অন্তত দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ, অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী থাকা আবশ্যক।
-
দেনমোহর নির্ধারণ – এটি বিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ। দেনমোহর নির্ধারণ না থাকলে ‘মোহরে মিছল’ ধার্য হবে।
দেনমোহর: নারীর শরয়ি অধিকার
- আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন:
“...তোমাদের আগে যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে সচ্চরিত্রা নারীদের বিয়ে করতে পারো, যদি তোমরা তাদের দেনমোহর প্রদান করো...”
— (সূরা মায়েদা, আয়াত ৫)
- মতামত দেওয়া হয় যে দেনমোহর নির্ধারণে পাত্র ও পাত্রী উভয় পক্ষের সম্মতি জরুরি। অথচ বাস্তবে অনেক সময় একচেটিয়াভাবে পুরুষপক্ষের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা শরিয়তের পরিপন্থী।
দেনমোহরের পরিমাণ:
সর্বনিম্ন সীমা:
- শরিয়তে সর্বনিম্ন দেনমোহর নির্ধারিত—১০ দিরহাম (৩০.৬১৮ গ্রাম রূপা বা প্রায় পৌনে ৩ ভরি খাঁটি রুপা)।
- নবীজী ﷺ বলেন:
"১০ দিরহামের কম কোনো দেনমোহর নেই।"
— (বায়হাকি শরীফ, ৭/২৪০)
দেনমোহর ছাড়া বিয়ে?
- কেউ যদি বলেন “আমি দেনমোহর ছাড়াই বিয়ে করব”—এটি শরিয়তসম্মত নয়।
- এমন চুক্তি বাতিলযোগ্য এবং স্ত্রীকে মোহরে মিছল অনুযায়ী দেনমোহর পরিশোধ আবশ্যক হয়ে যাবে।
মোহরে মিছল কী?
যদি দেনমোহর নির্ধারণ না করা হয়, তাহলে স্ত্রীর পরিবারের নারীদের (মা, বোন, ফুফু, চাচাতো বোন প্রভৃতি) ধর্মীয়তা, বয়স, সৌন্দর্য ও সামাজিক অবস্থানের অনুরূপ হিসাব করে সমমান মোহর ধার্য করতে হবে। (হেদায়া, পৃষ্ঠা ৩৭)
ব্লিচ বা সমাজিক ‘দেনমোহরহীন উদারতা’:
- অনেকেই “দেনমোহর না নিলে আমি উদার প্রমাণিত হব” এমন চিন্তা করেন, অথচ এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে খামখেয়ালিপনা এবং অজ্ঞতা।
- দেনমোহর ছাড়াও বিয়ে বৈধ নয় এবং স্ত্রীর অধিকার খর্ব হয়।
দেনমোহর হলো নারীর সম্মান, অধিকার এবং ইসলামী শরিয়তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং বাস্তবিকভাবে আদায়যোগ্য একটি অর্থনৈতিক ও নৈতিক দায়। মুসলিম সমাজে বিয়ের ব্যাপারে এ বিষয়ে সচেতনতা ও শরিয়তসিদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি খুবই জরুরি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শরিয়তের বিধান মেনে চলার তাওফিক দিন। আমিন।

No comments
ধন্যবাদ।