৮ মে: বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস
থ্যালাসেমিয়া: অজানা বাহক থেকে ভবিষ্যতের বিপদ
অনেকেই জানেন না যে তাঁরা থ্যালাসেমিয়ার বাহক। কারণ বাহক হলেও শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। তবে এই অজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভয়ংকর হতে পারে। থ্যালাসেমিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশনের (TIF) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১.৪ শতাংশ। দিন দিন এ সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে রোগীর সংখ্যাও।
৮ মে: বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস
এই দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ও মুগদা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন।
থ্যালাসেমিয়া কী?
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ। এ রোগে রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য দায়ী জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। হিমোগ্লোবিন হচ্ছে লোহিত রক্তকণিকার একটি প্রোটিন, যা শরীরজুড়ে অক্সিজেন পরিবহন করে এবং কার্বন ডাই–অক্সাইড ফুসফুসে ফিরিয়ে আনে।
মানবদেহে দুটি আলফা গ্লোবিন জিন (ক্রোমোজোম ১৬-তে) ও দুটি বিটা গ্লোবিন জিন (ক্রোমোজোম ১১-তে) থাকে। কোনো একটি জিন ত্রুটিযুক্ত হলে মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, আর একাধিক জিন ত্রুটিযুক্ত হলে তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হন।
থ্যালাসেমিয়ার ধরন
১. থ্যালাসেমিয়া মাইনর (বা ট্রেইট): বাহকের হয়, উপসর্গ নেই বা খুব সামান্য।
২. থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া: মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতা, কখনো কখনো রক্ত নিতে হতে পারে।
৩. থ্যালাসেমিয়া মেজর: তীব্র রক্তাল্পতা দেখা দেয়; নিয়মিত, অর্থাৎ প্রতি ২–৪ সপ্তাহে রক্ত নিতে হয়।
রোগের লক্ষণ
-
ফ্যাকাশে ত্বক
-
দুর্বলতা
-
জন্ডিস
-
শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া
-
প্লীহা বড় হওয়া
-
ক্ষুধামন্দা ও ওজন না বাড়া
থ্যালাসেমিয়া কীভাবে ছড়ায়?
যখন স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তখন তাঁদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
-
২৫% সম্ভাবনায় সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হতে পারে
-
৫০% সম্ভাবনায় সন্তান বাহক হবে
-
২৫% সম্ভাবনায় সন্তান সম্পূর্ণ সুস্থ থাকবে
তবে, যদি মা-বাবার মধ্যে কেবল একজন বাহক হন, তাহলে সন্তান বাহক হলেও থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হবে না।
প্রতিরোধে করণীয়
-
রক্ত পরীক্ষা: বিয়ের আগে হবু স্বামী-স্ত্রীর রক্তের CBC (Complete Blood Count), হিমোগ্লোবিন বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করানো উচিত।
-
সচেতন বিয়ে: কেউ যদি বাহক হন, তাহলে তার বিয়ের আগে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে সঙ্গী বাহক নন।
-
পরিবারে ইতিহাস থাকলে: পরিবারের কারও থ্যালাসেমিয়া থাকলে সবাইকে পরীক্ষা করানো জরুরি।
-
প্রসব-পূর্ব পরীক্ষা: দুজন বাহক দম্পতি গর্ভধারণ করলে ১২–১৮ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভের শিশুর থ্যালাসেমিয়া আছে কি না, তা পরীক্ষা করানো উচিত।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
শিশুর জন্মের এক–দুই বছরের মধ্যেই থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট) করলে অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে এটি ব্যয়বহুল এবং সুনির্দিষ্ট ডোনার দরকার হয়। না হলে নিয়মিত রক্ত দেওয়া ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী একটি স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি জীবনযাপন করতে পারে।
উপসংহার
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ সম্ভব যদি সবাই সচেতন হন। বাহক হিসেবে নিজের অবস্থান জানা এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমেই আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে পারি।

No comments
ধন্যবাদ।