কীভাবে আয় করবেন গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ?
গ্রাফিক্স ডিজাইন কী, এর গুরুত্ব, ব্যবহার, কীভাবে সফল গ্রাফিক ডিজাইনার হওয়া যায় এই বিষয়গুলো আমরা জানলাম। এখন আমএয়া জানবো কীভাবে গ্রাফিক্স ডিজাইনিং করে আয় করা যায় :
লোগো(Logo) ডিজাইন করে
যেকোনো ব্যবসার ব্র্যান্ডশীপ তৈরি করার জন্য লোগোর কোনো বিকল্প নেই। আপনি কোনো স্টার্টআপ(Start-up) নিয়ে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করতে চাইলে, শুরুতেই আপনাকে একটি লোগো তৈরি করতে হবে। আর এই লোগো তৈরীর কাজটি করে থাকেন গ্রাফিক্স ডিজাইনাররা।গ্রাফিক্স ডিজাইনের অনেকগুলো ক্ষেত্রর মধ্যে অন্যতম হলো লোগো ডিজাইন।
ফেসবুক, গুগল, পিন্টারেস্ট, ইন্সটাগ্রাম, টুইরারের মতো জনপ্রিয় প্লাটফর্মগুলোকে আমরা যেমন লোগো দেখেই চিনে ফেলতে পারি, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াতে লোগো অনেক জরুরী।
তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা বা সংগঠনের প্রায়ই নিজেদের কর্মকান্ড এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোগোর প্রয়োজন হয়। তখন তারা এমন ডিজাইনারদের খোঁজ করে থাকেন যারা তাদের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট এবং সেরা ডিজাইনটি করে দিতে পারবেন। আপনি যদি নিজেকে ভালো একজন গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে তারা আপনার পোর্টফলিও দেখে আপনাকেও কাজটি দিতে পারে।
আর আপনার কাজ দিয়ে আপনি তাদের সন্তুষ্ট করতে পারলে তারা আপনাকে ভালো মানেরই অর্থ দিবে। পাশাপাশি আপনার কাজ পছন্দ হলে আপনাকে তাদের স্থায়ী ডিজাইনার হিসেবেও নিয়োগ দিতে পারে। এভাবে সেখান থেকে আপনি অনেক আয় করতে পারবেন।
তাছাড়া আপনি ফ্রিল্যান্সিং সাইট যেমন ফাইভার.কম(Fiverr.com), ফ্রিল্যান্সার.কম(Freelancer.com), আপওয়ার্ক.কম(টঢ়ড়িৎশ.পড়স) ইত্যাদি সাইটেও লোগো ডিজাইনার হিসেবে কাজ করতে পারবেন। আপনি দেখবেন প্রায়ই দেশী-বিদেশি অসংখ্য মানুষ এসব সাইটে লোগো ডিজাইনার চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়। আপনার পোর্টফলিও দেখে তারা আপনাকে বেছে নিলে, সেখান থেকেও আপনি আয় করতে পারবেন। এভাবে ঘরে বসেই আপনি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকেই আয় করতে পারবেন ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে।
এর বাইরেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ লোগো ডিজাইনার চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দেন৷ আপনি সেখান থেকেও কাজ পেতে পারেন। আপনার কাজ তাদের পছন্দ হলে সেখান থেকেও আপনি অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।
ওয়েব ডিজাইন করে
মূলত ওয়েবসাইট ডিজাইন করে তিনভাবে অর্থ উপার্জন করা যায়৷ একটি হচ্ছে, কোনো ওয়েবসাইটের সাথে সরাসরি কাজ করে, আরেকটি হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং করে, আর অপরটি হচ্ছে নিজের ওয়েবসাইট খুলে।
একটি ওয়েবসাইটের ডিজাইন কেমন হবে, কীভাবে হবে সেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন একজন গ্রাফিক ডিজাইনার। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই দেখা যায়, আলাদা করে ওয়েব ডিজাইনার থাকলেও গ্রাফিক ডিজাইনার খুব একটা থাকে না। সেক্ষেত্রে তাদের আলাদা করে গ্রাফিক্স ডিজাইনার নিয়োগ দিতে হয়৷ আপনার সিভি(CV) এবং পোর্টফলিও দেখে যদি তারা আপনাকে নিয়োগ দেন, সেক্ষেত্রে আপনি কাজটি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারবেন। আর নিজের কাজ যদি তাদের সন্তুষ্ট করতে পারলে পরবর্তীতেও তাদের ডিজাইনার প্রয়োজন হলে আপনার কথাই তাদের মনে পরবে।
এছাড়াও আপনি ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটগুলোতে ওয়েব ডিজাইন করে সেখান থেকেও অর্থ উপার্জন করতে পারেন। কিন্ত এই ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হচ্ছে, আপনি যখন কোনো ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটে কাজ করবেন, তখন ঐ ওয়েবসাইটগুলো আপনার থেকে একটি নির্দিষ্ট অর্থ কেটে রাখবে। কিন্তু যদি আপনি আপনার নিজের ওয়েবসাইট খুলেন এবং সেখানে ওয়েব ডিজাইনিং সেবা দেওয়া চালু করেন সেক্ষেত্রে পুরো অর্থটাই আপনার কাছে থাকছে।
আপনি বিভিন্ন রকম গিফট ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে আপনার ওয়েবসাইটের ট্রাফিক বাড়াতে পারেন। তাছাড়া প্রথম প্রথম সেবা দেওয়ার সময় আপনি কিছুটা ডিসকাউন্ট দিতে পারেন। পরবর্তীতে তার কয়েকগুণ আপনি ফেরত পাবেন।
আপনার কাজ মানুষকে দেখাতে আপনি বেশ কিছু লাইভ ক্লাস নিতে পারেন। তাছাড়া আপনি অনলাইন ক্লাস বা অনলাইন কোর্সের আয়োজন করে সেগুলো বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন করতে পারেন।
ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি(Brand Identity) ডিজাইনার হিসেবে
যেকোনো ব্যবসার বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্র্যান্ডিং কিংবা ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি তৈরি হওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সাধারণত ব্র্যান্ডিং ডিজাইন বলতে মার্চেন্ডাইজ(Merchandise) বা পণ্য ডিজাইন, লোগো ডিজাইনিং, বিজনেস কার্ড ডিজাইনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো ডিজাইন করাকে বোঝানো হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করতে গ্রাফিক ডিজাইনিং দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
সাধারণত এই কাজগুলোর জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা করে গ্রাফিক্স ডিজাইনার রাখেনা, কারণ তা কিছুটা ব্যয়বহুল। সেক্ষেত্রে তারা গ্রাফিক ডিজাইনার নিয়োগ দেন বা ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটগুলোতে গ্রাফিক্স ডিজাইনার চেয়ে পোস্ট দেন। সেখানে আপনার পোর্টফলিও দেখিয়ে আপনি খুব সহজেই কাজটি পেয়ে যেতে পারেন। আর আপনার কাজে তারা মুগ্ধ হলে দেখা যাবে পরবর্তীতে তারা যখন কোনো ব্র্যান্ড বানাবে, সেটার আইডেন্টিটি ডিজাইনিং এর দায়িত্বও আপনিই পেয়েছেন।
ফ্রিল্যান্সিং করে
গ্রাফিক ডিজাইনের সর্ববৃহৎ ক্ষেত্র খুব সম্ভবত ফ্রিল্যান্সিং। আপনি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গ্রাফিক ডিজাইনিং করতে চাইলে আপনার হাতে অসংখ্য বিকল্প রয়েছে। আপনি ওয়েব ডিজাইনিং করে, ম্যাগাজিন বা বুক কভার (Book Cover) ডিজাইন করে, টি-শার্ট বা লোগো ডিজাইন করে, ভেক্টর আর্ট করে, বিজনেস, ইনভাইটেশন বা ভিজিটিং কার্ড তৈরি করা সহ আরো অনেকভাবেই আপনি গ্রাফিক ডিজাইনিং করে অর্থ আয় করতে পারেন।
এখন কথা হচ্ছে, একসাথে এতোগুলো কাজ আপনি একত্রে কোথায় পাবেন? এর উত্তর হচ্ছে একসাথে এতোগুলো কাজ আপনি কেবলমাত্র ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটেই পেতে পারেন। ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটগুলোতে এতো এতো কাজ রয়েছে যে আপনি আপনার নিজের দক্ষতা ও সুবিধা অনুযায়ী যেটা বা যেগুলো ইচ্ছে, সেটা বা সেগুলোই বেছে নিতে পারবেন।
বিশ্বে জনপ্রিয় অনেকগুলো ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইট রয়েছে, যেমন :
- ফ্রিল্যান্সার.কম(Freelancer.com)
- ফাইভার.কম(Fiverr.com)
- আপওয়ার্ক.কম(Upwork.com)
- পিপলপারআওয়ার.কম(PeoplePerHour.com)
- নাইন্টিনাইনডিজাইনস.কম(99designs.com) ইত্যাদি
ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার জন্য আপনার এই ওয়েবসাইটগুলোর যেকোনো একটি বা একাধিক ওয়েবসাইটে একাউন্ট খুলতে হবে। তারপর আপনি সেখানে দেখবেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ক্লায়েন্ট বা প্রতিষ্ঠান তাদের নিজ নিজ কাজের জন্য গ্রাফিক্স ডিজাইনার চেয়ে পোস্ট দিয়েছেন। আপনার পারিশ্রমিক, বিশেষত্ব, কাজের ধরণের উপর আপনি কাজ বাছাই করে নিতে পারবেন আর সেখান থেকে আয় করতে পারবেন৷
অ্যানিমেশন(Animation) ডিজাইনার হিসেবে
প্রায় ২৫ বছর অ্যানিমেটেড ইমেজেসের রাজত্ব চললেও বিগত তিন-চার বছরে তা অন্য মাত্রায় চলে গেছে। আজকাল ডিজিটাল কমিউনিকেশনে প্রায় সবাইই স্টোরি পাবলিশ থেকে শুরু করে অনুভূতি প্রকাশ করা, সবখানেই গিফ(GIF) ব্যবহার করে৷ এই গিফ হচ্ছে এনিমেটেড বা স্থিরচিত্র প্রদর্শনের একটি ফরম্যাট।
ইন্সটাগ্রাম যখন স্টোরিতে গিফের ব্যবহার চালু করলো, তখন ইন্সটাগ্রামের অনেকগুলো ব্র্যান্ড এটিকে ব্র্যান্ডের সচেতনতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে চিন্তা করলো। তখন তারা কাস্টম গিফ আপলোড করা শুরু করলো যাতে সকলেই ব্যবহার করতে পারে।
এখন যেহেতু গিফের ট্রেন্ড চলছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন চাচ্ছে এনিমেটেড ইমেজ বা ছবি ক্রয় করে, সেগুলো গিফ আকারে কমিউনিকেশনে ব্যবহার করতে। তাই আপনার যদি এনিমেটেড ইমেজ ডিজাইনিংয়ে দক্ষতা থেকে থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি এগুলো ডিজাইন করে তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারবেন। তাছাড়া আপনি বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটেও এই এনিমেটেড ছবিগুলো বিক্রি করে আয় করতে পারেন।
গ্রাফিক্স ডিজাইনের অনেক বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলোর কয়েকটির কথা কেবল বলা হয়েছে এখানে। এগুলো ছাড়াও আরো অসংখ্য উপায়ে গ্রাফিক্স ডিজাইনিং করে অর্থ আয় করা যায়৷
শেষ কথা
গ্রাফিক্স ডিজাইন কী এবং এর বিস্তৃতি যে কতটা বৃহৎ তা আমরা কিছু আন্দাজ করতে পারছি। বর্তমানে, বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হচ্ছে গ্রাফিক্স ডিজাইন। তাই আপনার যদি গ্রাফিক্স ডিজাইনিং ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে আপনি নিশ্চিন্তেই শুরু করতে পারেন। আশা করা যায়, আপনার সামনে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।
No comments
ধন্যবাদ।