Header Ads

Header ADS

হাসানাতের কথার বাইরে গেলে সাগরে নিক্ষেপ

 গৌরনদী উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চান পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারিছুর রহমান। তিনি স্থানীয় এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর খুবই আস্থাভাজন।


সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের হুমকি দিচ্ছে হারিছের অনুসারীরা। এক ছাত্রলীগ নেতা তো বলেই ফেলেছেন, দলের কোনো নেতা হাসানাতের কথার বাইরে গিয়ে প্রার্থী হলে তাকে ‘বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা হবে’। এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও ওই ছাত্রলীগ নেতা তাঁর বক্তব্যে অনড়। 




মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার চাঁদশী ইউনিয়নের চাঁদশীহাটে আওয়ামী লীগের কর্মিসভায় সরকারি গৌরনদী কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নাহিয়ান হোসেন রাতুল হারিছের পক্ষে উত্তেজক বক্তব্য দেন।


তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিভাবক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ যে সিদ্ধান্ত দেন, যে ইশারা দেন, সেটি আমাদের জন্য চূড়ান্ত, চূড়ান্ত এবং চূড়ান্ত। হাসানাত আবদুল্লাহর সিদ্ধান্ত হলো, হারিছুর রহমান হারিছ ভাই একমাত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী। তা ছাড়া কোনো প্রার্থী গৌরনদীতে নাই, চাঁদশী ইউনিয়নে নাই। কোনো কুচক্রী মহল আঙুল তুলে দাঁড়াতে চাইলে ছাত্রলীগ তথা গৌরনদীর সাধারণ জনগণ তাদের চাঁদশীর মাটি থেকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করবে। আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর সিদ্ধান্ত সবার আগে চাঁদশী থেকেই বাস্তবায়ন হবে। 



আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর সিদ্ধান্তের বিপক্ষে যদি কেউ দাঁড়ায়, আল্লাহর কসম– চাঁদশীর মাটিতে তার স্থান হবে না।’ 


সম্ভাব্য প্রার্থী হারিছের পক্ষে এ সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরাও উপস্থিত ছিলেন। 


হারিছ ২০১২ সাল থেকেই গৌরনদী পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান সমকালকে বলেছেন, তাঁর ভাই হারিছ ‘গৌরনদীর দানব’। 


গুঞ্জন রয়েছে, হারিছকে উপজেলা চেয়ারম্যান বানিয়ে উপনির্বাচনে পৌর মেয়র হবেন হাসানাতের মেজ ছেলে মঈন আবদুল্লাহ। এক সপ্তাহ পর্যন্ত ভোটের মাঠে হারিছের গরম উপস্থিতি সেই গুঞ্জনকেই শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। পাশাপাশি তা ভোটের মাঠে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। 


নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান সমকালকে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাগনে হাসানাত জেলায় সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা। গত এক দশকের বেশি গৌরনদী-আগৈলঝাড়ায় তাঁর সকল আদেশ-নির্দেশ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন হয় হারিছের মাধ্যমে। প্রত্যেক ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে হারিছের পক্ষে কর্মিসভা করার। 


তৃতীয় ধাপে এখানে ভোট গ্রহণ করা হবে ২৯ মে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২ মে।


হারিছের ভাই হাবিবসহ আরও দুই সম্ভাব্য প্রার্থী সমকালকে বলেন, তারা ভোটে দাঁড়াতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সন্দিহান। তারা গত সপ্তাহে বরিশালে পুলিশের ডিআইজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ও নিজেদের নিরাপত্তা চেয়েছেন বলে জানা গেছে। 


বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী মনিরুল নাহার মেরীর গ্রামের বাড়ি চাঁদশীর নাটৈ গ্রামে। মঙ্গলবার চাঁদশীহাটের জনসভায় হুমকি তাঁকেই দেওয়া হয়েছে বলে সমকালকে বলেছেন মেরী। তিনি বলেন, এসব হুমকি দিয়ে তাঁকে থামানো যাবে না। তিনি প্রার্থী হবেনই।


এসব হুমকির পেছনের কার মদত থাকতে পারে, জানতে চাইলে মেরী মন্তব্য করতে রাজি হননি। হাসানাতের প্রার্থী হিসেবে আগের দুটি নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। 


ডিআইজির সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে জানতে চাইলে মেরী বলেন, তাঁর একটি বিষয়ে কথা বলতে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে গিয়েছিলেন। একই ভবনে ডিআইজির দপ্তর হওয়ায় তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়নি। 


তবে আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি মনির হোসেন মিয়া বলেন, হুমকি দিয়ে তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরানো যাবে না। ডিআইজির সঙ্গে দেখা করে সুষ্ঠু নির্বাচন ও নিরাপত্তা চেয়েছেন। ডিআইজি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন। 


প্রার্থী হতে অনেক আগেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন হারিছের ভাই হাবিবুর। তিনি সমকালকে বলেন, হারিছ বাহিনী যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তাতে প্রার্থী হওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। গত ৬ মার্চ সহস্রাধিক সন্ত্রাসী নিয়ে তাঁর বাড়িতে হামলা চালানো হয়। 


হাবিবুরের অভিযোগ, তারা সম্ভাব্য চার প্রার্থী ঢাকায় হাসানাত আবদুল্লাহর বাসায় গিয়ে ভোটের বিষয়ে কথা বলেছিলেন। তখন হাসানাত বলেছেন, দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো প্রার্থীর প্রতি তাঁর সমর্থন থাকবে না। ৬ মার্চ ভারত থেকে আসার পর জানান, আগৈলঝাড়ায় তাঁর ছোট ছেলে আশিক আবদুল্লাহ ও গৌরনদীতে হারিছ তাঁর প্রার্থী। 


উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি প্রার্থী হবেন না। হাসানাত তাঁকে হারিছের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেওয়ায় তাঁর কর্মিসভায় যাচ্ছেন। 


অন্য কাউকে প্রার্থী না হওয়ার হুমকি-ধমকি প্রসঙ্গে জয়নাল বলেন, চাঁদশীর কর্মিসভায় ছাত্রলীগের রাতুল বেশি খারাপ কথা বলেছে। আরও দুয়েকজন বলেছেন। এটা ঠিক হয়নি।


তিনি বলেন, গৌরনদী-আগৈলঝাড়া উপজেলা চেয়ারম্যানদের কাজ করার সুযোগ নেই। হাসানাত আবদুল্লাহ নিজেই উন্নয়নকাজ বণ্টন করেন। 


ছাত্রলীগ নেতা রাতুল বলেন, ‘হাসানাত ভাইয়ের দোয়া সমর্থন হারিছ ভাইয়ের ওপর আছে। আমি এখনও বলতে চাই, হাসানাত ভাইয়ের সিদ্ধান্তের বাইরে, আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ উটকো ঝামেলা করলে তাকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করব।’


পৌর মেয়র ও সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হারিছ বলেন, তাঁর কর্মিসভায় রাতুল অযৌক্তিক বক্তব্য দিয়েছেন। এই বক্তব্য তিনি সমর্থন করেন না। হারিছের দাবি, তিনি গৌরনদীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন চান।


আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা জানান, ২০১২ সালে পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর হারিছ ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হন। শুধু বিএনপি নয়, দলের নেতাকর্মীও তাঁর নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। প্রতিপক্ষকে দমনে হারিছের নতুনত্ব হচ্ছে– ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া। এ পর্যন্ত অসংখ্য বিএনপি নেতাকর্মীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তালা ঝোলানোর পর নানাভাবে আপসরফা করে খুলে দেওয়া হয়। গত জুনে উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক হাফেজ নুরুল হক তালুকদারকে বাসায় ডেকে নির্যাতনের পর দীর্ঘদিন গৃহবন্দি থাকতে বাধ্য করা হয়। 


পৌর আওয়ামী লীগ নেতা আলী হোসেন গব্বারকে মারধর করা হয় একাধিকবার। তিনি সমকালকে বলেন, ‘এটা আমার ভাগ্যে ছিল। হারিছ পুরোনো আওয়ামী লীগের অনেকের গায়ে হাত দেছে। নেতার (হাসানাত) কাছে বিচার পাই নাই। এখন আল্লাহর কাছে বিচার দিছি।’ 

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.