Header Ads

Header ADS

শুরু হচ্ছে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’

শুরু হচ্ছে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’

‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’: সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্তি বাতিল করে একটি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাত সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন। সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, এবং দফায় দফায় আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত সেই দাবি পূরণের পথে অগ্রসর হয়েছে সরকার।

দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও আলোচনার পর রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সাত সরকারি কলেজকে নিয়ে গঠিত হতে যাচ্ছে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ (DCU) নামের একটি নতুন স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়। এটি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে প্রথম পর্যায়ে ৪টি অনুষদে ২৩টি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে।

উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ভর্তির সুযোগ: দেশের প্রথম

বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও ভর্তি হতে পারবে, যা দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে।

প্রশাসনিক কাঠামো ও পরিচালনা

যাত্রার শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হবে একজন উপাচার্য (ভিসি), দুজন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক ও প্রশাসনিক), একজন কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার), একজন প্রধান প্রক্টর এবং সাত কলেজে একজন পুরুষ ও একজন নারী—এভাবে মোট ১৪ জন ডেপুটি প্রক্টর। অর্থাৎ প্রক্টরিয়াল বডিতে থাকবেন মোট ১৫ সদস্য

বর্তমানে জাতীয় সংসদ না থাকায়, এ-সংক্রান্ত আইন পাসের সুযোগ নেই। তাই প্রাথমিকভাবে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালুর সম্মতি দেবেন রাষ্ট্রপতি।

শিক্ষার ধরণ: ইন্টারডিসিপ্লিনারি ও হাইব্রিড

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষাব্যবস্থা হবে ইন্টারডিসিপ্লিনারি এবং হাইব্রিড ধাঁচের। ক্লাসের ৪০ শতাংশ হবে অনলাইনে এবং ৬০ শতাংশ অফলাইনে, তবে সব পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে সশরীরে। প্রথম চার সেমিস্টারে শিক্ষার্থীরা পড়বে নন-মেজর কোর্স এবং পরবর্তী চার সেমিস্টারে মেজর কোর্স। পঞ্চম সেমিস্টারে শর্তসাপেক্ষে ডিসিপ্লিন পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে, যদিও কলেজ পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না।

২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীরা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নামেই ডিগ্রি ও সনদপত্র পাবেন। তবে যাঁরা বর্তমানে অধ্যয়নরত, তাঁরা আগের নিয়মেই তাদের কোর্স সম্পন্ন করবেন।

আন্দোলনের পেছনের প্রেক্ষাপট

২০১৭ সালে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি কাঠামো ছাড়াই রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই দেখা দেয় একাধিক সমস্যা—সেশনজট, ফল প্রকাশে বিলম্ব, অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকট, এবং সনদ জটিলতা। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনের চাপে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠন করে একটি পর্যালোচনা কমিটি।

পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নেতৃত্বে গঠিত হয় আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি। তারা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক শেষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাবির অধিভুক্তি বাতিল এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের সুপারিশ পেশ করে।

এই সুপারিশের পর প্রশাসনিক কাঠামো ও বাস্তবায়নের বিষয়ে একাধিক বৈঠক করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অবশেষে, বহু প্রতীক্ষার পর নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে।

আসছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

আজ সোমবার একটি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের বিস্তারিত ঘোষণা দেবেন বলে জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চারটি প্রধান স্কুল বা অনুষদে ভাগ করে পরিচালিত হবে। স্কুল অব সায়েন্স পরিচালিত হবে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা কলেজ থেকে। স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ এবং স্কুল অব বিজনেস স্টাডিজ চালু হবে সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজে। আর স্কুল অব ল অ্যান্ড জাস্টিস পরিচালিত হবে কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে।

স্নাতক (অনার্স) পর্যায়ে মোট ২৩টি বিষয়ে পাঠদান করা হবে, প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ ৪০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবেন। মূল ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজের প্রায় ২৫ একর জমির উপর। সেখানেই প্রশাসনিক ভবন, লাইব্রেরি, মেডিকেল সেন্টার ও ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) প্রতিষ্ঠা করা হবে। পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে একাডেমিক কাউন্সিল, সিনেট এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।

কলেজগুলো শুধুমাত্র অনার্স পর্যায়ে শিক্ষা দেবে, তবে সাতটি কলেজের মধ্যে পাঁচটিতে আগের মতোই উচ্চমাধ্যমিক স্তর চালু থাকবে। ইডেন ও কবি নজরুল কলেজে নতুন করে উচ্চমাধ্যমিক স্তর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই ক্যাম্পাসে অনার্স ও এইচএসসি শিক্ষার্থীরা টাইম, স্পেস ও রিসোর্স শেয়ারিং-এর মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বাজেট ব্যবস্থাপনা সবই কেন্দ্রীয়ভাবে হবে। প্রতিটি কলেজে থাকবে ওয়ানস্টপ সার্ভিস, আধুনিক লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া, মেডিকেল সেন্টার ও পরিবহন সুবিধা।

ধাপে ধাপে গঠনের পরিকল্পনা

বিশ্ববিদ্যালয়টি চার ধাপে প্রতিষ্ঠা পাবে:

  1. খসড়া আইন প্রণয়ন ও অনুমোদন এবং অধ্যাদেশ জারি
  2. শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি
  3. উপাচার্য নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু
  4. শিক্ষা কার্যক্রম শুরু

তবে, ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজ মেয়েদের এবং ঢাকা কলেজ ছেলেদের হওয়ায় লিঙ্গ-ভিত্তিক শিক্ষার্থীদের প্রবেশ বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত স্পষ্ট নয়। তাছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়টিও অভূতপূর্ব এবং প্রশ্নবিদ্ধ।

ভর্তি বিষয়ক তথ্য

ভর্তি কার্যক্রম হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। ২০১৯–২০২২ সালের এসএসসি ও ২০২৩ বা ২০২৪ সালের এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন। যারা আগে সাত কলেজের অধীনে আবেদন করেছিলেন, তারা চাইলে ৩ থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে আবেদন প্রত্যাহার করতে পারবেন এবং টাকা ফেরত পাবেন। নতুন আবেদনও এই সময়ের মধ্যে করা যাবে (https://collegeadmission.eis.du.ac.bd)। আবেদন ফি ৮০০ টাকা।

ভর্তি পরীক্ষা:

  • ২২ আগস্ট (কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ): বিকেল ৩টা–৪টা
  • ২৩ আগস্ট (বিজ্ঞান অনুষদ): সকাল ১১টা–দুপুর ১২টা
  • ২৩ আগস্ট (ব্যবসা অনুষদ): বিকেল ৩টা–৪টা

প্রবেশপত্র ডাউনলোড: ১৭ আগস্ট
আসন বিন্যাস: ২০ আগস্ট থেকে

বিষয়ের তালিকা:

  • ঢাকা কলেজ: গণিত, পরিসংখ্যান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ডাটা সায়েন্স, বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োটেকনোলজি, রসায়ন
  • ইডেন কলেজ: পদার্থবিজ্ঞান, অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি, ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, ফরেস্ট্রি
  • বদরুন্নেসা কলেজ: আরবান ও রুরাল প্ল্যানিং, এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট
  • তিতুমীর কলেজ: অ্যাকাউন্টিং, ফিন্যান্স, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, হোটেল ও হসপিটালিটি, মার্কেটিং, ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স
  • বাঙলা কলেজ: সাংবাদিকতা, ফটো ও ভিডিওগ্রাফি, সমাজবিজ্ঞান, পলিটিক্যাল ইকোনমি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি
  • কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ: ল অ্যান্ড জাস্টিস

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরের ঐতিহ্যবাহী সাতটি কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমে নতুন গতির সূচনা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস জানান, তারা কলেজগুলোর স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার পক্ষে। যেমন—ঢাকা কলেজ ছেলেদের এবং ইডেন-বদরুন্নেসা মেয়েদের—এ ব্যবস্থা যেন পরিবর্তন না হয়।

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.