আম্মু! একটু বাহিরে যাই?একটু দেখি না আম্মু কী হয় বাহিরে! শহীদ মুহাম্মাদ আশিকুল ইসলাম
শহীদ মুহাম্মাদ আশিকুল ইসলাম
শহীদ হওয়ার স্থান-বনশ্রী,রামপুরা,ঢাকা।
১৯ই জুলাই ২০২৪, শুক্রবার,দুপুর তিনটা।
"আম্মু! একটু বাহিরে যাই?একটু দেখি না আম্মু কী হয় বাহিরে! একটু দেখি! একটু দেখি! একটু দেখে আসি আম্মু! একটু দেখি! একটু দেখি!"
আম্মুর সাথে শহীদ আশিকের এটাই ছিলো শেষ কথোপকথন। আম্মু সারাদিন বাইরে এত গোলাগুলি-গণ্ডগোল দেখে আশিককে বের হতে দিচ্ছিলেন না কিছুতেই। বারবার জোর করে হাত ধরে রেখে বাইরে যেতে বাঁধা দিচ্ছিলেন। অনেকবার নিষেধ করছিলেন। কিন্তু শহীদ আশিক এত নিষেধ সত্ত্বেও বারবার একটু দেখে আসি আম্মু বলে-বলে অবশেষে দুপুর তিনটার দিকে বাসা থেকে বের হতে পারলেন। ১৮ই জুলাইয়ের মতো গণহত্যার দিনে রামপুরা-বনশ্রীর যুদ্ধের ময়দানে সর্বক্ষণের যোদ্ধা শহীদ আশিক কী ১৯ শে জুলাইতে আন্দোলনে না গিয়ে ধারাবাহিকতাটা মিস করবেন!
শহীদ আশিকের পরিবার ছিলো সাধারণ একটা অরাজনৈতিক পরিবার। শহীদ আশিকের মাত্র দুবছর বয়সেই মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আম্মুকে সবাই ছোট্ট আশিককে বাবার কাছে দিয়ে নতুন করে আবার সংসার শুরু করতে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু আম্মু ছোট্ট আশিকের কী হবে ভেবে এইসব প্রস্তাব নাকচ করে আশিককে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে দর্জির কাজ করে নতুন করে জীবন-সংগ্রাম শুরু করেন। ছোটবেলায় মা-বাবা হারানো আম্মুর জন্য আশিকই ছিলো একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন।
এভাবেই আম্মু আশিককে নিয়ে একা-একা সব কষ্টের সাথে জীবনযুদ্ধ করছিলেন । আশিকের বাবা আম্মুর একমাত্র সম্বল জমিটাও আত্মসাৎ করে আশিকদের কখনোই আর কোন খোঁজ-খবর রাখেনি। আশিক কখনো দাদুর পরিবারে বেড়াতে গেলেও কেউই থাকতে দিতে চাইতে না। একটু খাবারও পর্যন্ত খেতে দিতে চাইতো না। আম্মু কাজের ব্যস্ততায় ছোট্ট আশিককে বাবার আত্মীয়দের কারো বাসায় রাখতে চাইলেও কেউ রাখতে চাইতো না। এমনকি আশিক শহীদ হওয়ার পরে আম্মু একা-একা লাশটা গ্রামে নিয়ে গেলে দাদার পরিবারের কেউ কবরটা পর্যন্ত খোঁড়ার ব্যবস্থাও পর্যন্ত করেনি। এভাবে ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দাদা বাড়ীর নানা অবহেলায় আশিক বড় হচ্ছিলেন।
ক্লাশ টুতে আশিককে কষ্ট করে আম্মু নিবরাস মাদরাসায় ভর্তি করে দেন। আম্মু টেইলারিংয়ের কাজ করলেও আশিককে সর্বোচ্চ যতেœর সাথে রাখতেন। সবসময় পছন্দের খাবার খাওয়াতেন। সব ইচ্ছে পূরণ করার চেষ্টা করতেন সর্বোচ্চ।
আশিক আম্মুর কাছে সবসময় বাসায় থাকতেন। সবসময় আম্মুকে কাজে হেল্প করতেন। এত ছোট মানুষ হওয়ার পরও আম্মু কাজ থেকে ফিরলে আম্মুকে রান্না করে খাওয়াতেন। রান্নাগুলোও অনেক মজা হতো আম্মু বলতেন। বয়সে ছোট হলেও সব কাজ দায়িত্ব নিয়ে পালন করতেন। দোকানের কাজেও আম্মুকে হেল্প করতেন।
আশিক ছিলেন বয়সের তুলনায়ও অনেক লম্বা এবং স্বাস্থ্যবান। গ্রামে গেলে সবাই বলতো পুরো দিনাজপুরে ওঁর মতো এমন সুন্দর ছেলে আর একটাও নাই। আশিকের ছয়মাস বয়সী একটা ছোটভাই আছে। এই ভাইটাকে অনেক আদর করে আশিক ছোট্ট কলিজা নামে ডাকতেন। সবসময় ছোটভাইটার সাথে লেগে থাকতেন।
মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে আশিক আম্মুকে বিদেশে পড়তে যাবার স্বপ্নের কথা বলেন। আম্মু বলেন, আগে মেট্রিকটা পাশ করো বাবা! এরপর আমি তোমাকে বিদেশে পড়তে যাবার ব্যাপার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।
মৃত্যুর দুইদিন পূর্বে ১৭ই জুলাই আম্মুর টাকা-পয়সার এত অভাব হতে দেখে আশিক আম্মুকে বলেন, আম্মু আমি অনলাইনতো ভালো বুঝি। তাহলে আমি এখন থেকে অনলাইনে কাজ করা শুরু করি। অনলাইনে একটা পেইজ খুলে তোমার বিজনেসটা দেখা শুরু করি। তাহলে তো আম্মু তোমার কষ্ট অনেক কমে যাবে!
১৮ই জুলাই আশিক আন্দোলন থেকে বাসায় ফিরে , এত ভয়ানক পরিস্থিতি দেখে আম্মুকে বলতে থাকে, আম্মু! আমি আর কখনোই আন্দোলনে বের হবো না। শহীদ হওয়ার পরে সবার মনে পড়তে লাগলো, আশিক না বলেছিলো আর কখনো আন্দোলনে যাবে না। ওঁ আবার কীভাবে বের হতে পারলো!
১৯ শে জুলাই ২০২৪, শুক্রবার, বিকাল ৪.৩০ মিনিট।
শহীদ আশিক দুপুর তিনটায় বাসা থেকে বের হয়ে বনশ্রী জি ব্লকের তিন নম্বর রোডে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। অপরিচিত যারা আন্দোলনে এসেছিলো সবাইকে আশিক নানাভাবে হেল্প করছিলেন। এই সময়টায় হেলিকপ্টার থেকে পুলিশ লাগাতার গুলি ছুঁড়ছিলো। তখন এই এরিয়াটা ভালোজানা চেনা আশিক অনেক স্টুডেন্টকে হেলিকপ্টারের গুলি থেকে বের করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান। ৪.৩০ এর দিকে ছাত্রজনতা যখন প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে বনশ্রীর ব্লক জি ১নং নম্বর রোডে আন্দোলন করছিলেন। তখন বিজিবির কয়েকজন সদস্য গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে-হেঁটে বনশ্রীর মতো আবাসিক এলাকার ভেতরে ঢুকে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে থাকে। তখন আশিক সহ আরো পঞ্চাশ জন আন্দোলনকারী গুলি থেকে বাঁচতে পালিয়ে আশেপাশের বাড়িগুলোর ভেতরের দিকে ঢুকতে চায়। অনেকে বাড়িগুলোতে ঢুকতে পারলেও আশিক সহ আরো কয়েকজন ঢুকতে পারেননি। এইসময় ৮০ মিটার দূরের চাররাস্তার মোড় থেকে বিজিবির এলোপাথাড়ি ছুঁড়তে থাকা একটা বুলেট এসে আশিকের মাথার ডান কানের পেছন দিয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে বামকানের পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। সাথে-সাথেই নির্মানাধীন একটা বাড়ির ইটের কংকরের ম্তূপের উপর লুটিয়ে পড়েন আশিক। শহীদের রক্তে বনশ্রীর রাজপথ ভেসে যায়।
শহীদ আশিক বিকেলের পরও বাসায় না ফিরলে আম্মু চিন্তিত হয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করতে শুরু করেন। বারবার আশিকের উপর রাগ করতে থাকেন, ওঁ কেন এতক্ষণ বাহিরে! এখনও কেন বাসায় ফিরছে না! আশিক নিজের ফোনটা বাসায় রেখে যাওয়ায় কোন যোগাযোগও করতে পারছিলেন না সেদিন আর।
এরপর অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাত ১০টায় সবার ফোনে-ফোনে কয়েক ঘন্টা আগে বাসা থেকে বের হওয়া নিজের জলজ্যান্ত ছেলেটার রক্তাক্ত লাশের ছবি দেখতে পান। পুরো শরীর এবং চেহারাভর্তি ভর্তি রক্ত থাকার কারণে এলাকার পরিচিত মানুষরাও চিনতে পারছিলো না আশিককে। সবার কাছ থেকে জানতে পারেন যে, আশিক এখন এডভান্স হাসপাতালে আছেন। এডভান্স হাসপাতালের দুই-তিনটা বেড আশিকের রক্তে রক্তাক্ত হয়ে যায়। পুরো ফ্লোরভর্তি ছিলো আশিকের রক্তের স্রোত। আম্মু হারিয়ে ফেলেন তাঁর একমাত্র রতনটাকে চিরদিনের জন্য এত দ্রুত।
এরপর আম্মু এডভান্স হাসপাতাল থেকে আশিকের লাশ নিয়ে রাত ১ টার দিকে এম্বুলেন্সে করে দিনাজপুর নিয়ে যান শহীদ আশিককে। পরেরদিন ২০ই জুলাই যোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে শহীদ আশিককে দিনাজপুরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
আম্মুর দোকানের আগের পরিচিত আওয়ামীলীগের সমর্থক কাস্টমাররা যখন জানতে পারে যে আম্মুর আশিক শাহাদাত বরণ করেছেন জুলাই বিপ্লবে ।
তখন আম্মুকে আওয়ামীলীগাররা বলে,আপনার ছেলে কেন বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে গেছে! কেন বের হইছে!
আম্মু পরিচিত আওয়ামীলীগারদের থেকে শুনতে থাকেন এসব ঘৃন্য কথাবার্তা-মন্তব্য। আর দিনশেষে নিজের ছেলের খুনিদের বিচারে ধীরগতি-অবহেলা দেখে হতাশায় নিমজ্জিত হন।
পুরো নাম: মুহাম্মাদ আশিকুল ইসলাম।
পিতা: ফরিদুল ইসলাম।
মাতা: আরিশা আফরোজ।
জন্মতারিখ: ৭ই মে ২০১০ ।
শাহাদাতের দিন: ১৯ শে জুলাই ২০২৪, শুক্রবার।
পেশা: স্টুডেন্ট,নবম শ্রেণী, নিবরাস ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা,বনশ্রী ,ঢাকা। পাশাপাশি হেফজও করছিলেন।
শহীদ হওয়ার স্থান: বনশ্রী, রামপুরা ,ঢাকা।
যাদের গুলিতে শহীদ: বিজিবির গুলি সরাসরি মাথায় লেগে সাথে-সাথেই শাহাদাত বরণ করেন।

No comments
ধন্যবাদ।