Header Ads

Header ADS

১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোল তখনই নিভে যায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, তাহির জামান প্রিয়, ফারহান ফাইয়াজ, রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ

মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, তাহির জামান প্রিয়, ফারহান ফাইয়াজ, রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ

১৮ জুলাইয়ের সন্ধ্যায় ঢাকায় উত্তরের আকাশে যখন রক্তাক্ত সূর্য ডুবছিল, তখনই নিভে যায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের জীবন।

১৮ জুলাইয়ের সেই সন্ধ্যায় ঢাকার উত্তরা এলাকায় যখন আন্দোলনের উত্তেজনা চূড়ায়, তখন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ধপ করে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। চারদিকে ধোঁয়া, আতঙ্ক আর চিৎকার—তার মধ্যেই রক্তে ভেসে যেতে থাকে সেই রাস্তাটা, যেখানে কিছুক্ষণের আগেও মুগ্ধ দাঁড়িয়ে ছিলেন সহযোদ্ধাদের পাশে।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর এই শিক্ষার্থী সেদিন কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিক্ষোভে অংশ নিতে এসেছিলেন নিজ এলাকায়, উত্তরায়। তার বাসাও ছিল সেখানেই।

মুগ্ধের বন্ধুরা চেষ্টা করেও সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিতে পারেননি তাকে। “অসংখ্য পুলিশ তখন অস্ত্র হাতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিলো,” বলছিলেন মুগ্ধের বন্ধু আশিক। পরিস্থিতির ভয়াবহতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি রিকশা পেয়ে মুগ্ধকে নিয়ে যাওয়া হয় নিকটস্থ ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার সময় মুগ্ধের একদম কাছে ছিলেন তার আরেক বন্ধু জাকিরুল ইসলাম। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “গুলি লেগেছিলো কপালে—যেখানে মেয়েরা টিপ পরে, ঠিক সেখানে। ডান কানের পাশ দিয়ে গুলিটা বের হয়ে যায়।”

জাকিরের কণ্ঠে তখনো রক্তমাখা মুহূর্তের আতঙ্ক—“গুলির পর ওর মাথার ভেতরের অংশ বের হয়ে গেছিলো। ঘটনাস্থলেই, আমাদের চোখের সামনে ও মারা গেল। আমরা কারো ক্ষতি করিনি। মুগ্ধ শুধু আমাদের সবার হাতে পানি তুলে দিচ্ছিল। অথচ আমার বন্ধুকে এভাবে গুলি করে মেরে ফেলল! আমি কীভাবে এই দৃশ্য ভুলবো?”

সেদিন শুধু উত্তরা নয়, পুরো ঢাকা ছিল বিক্ষোভে উত্তাল। সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল শহরের নানা প্রান্তে। নিহত হন আরও অনেকে। তাদের মতো মুগ্ধও এখন ফেসবুকজুড়ে একটি প্রতীকী মুখ—সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রতিবাদী, উদার তরুণ, যার স্মৃতিচারণে মুখর তার পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীরা।

মুগ্ধের মৃত্যু শুধু এক ছাত্রের নয়—একটি সময়ের, একটি সম্ভাবনার, এক নির্মম বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

"পাঁচদিন পর জানলাম, প্রিয় আর নেই"

চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০ জুলাই রাজধানীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

তার বন্ধুদের ভাষ্যমতে, মৃত্যুর পর দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় পড়ে ছিলেন প্রিয়। কেউ এগিয়ে আসেনি, কেউ হাসপাতালে নিতে পারেনি। অনেক সময় পর তার মরদেহ পাওয়া যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ফারিয়া উলফাত সৈয়দ লিখেছেন, বিকাল পাঁচটার দিকে গ্রিন রোডের ল্যাবএইড হাসপাতালের পেছনে তিনি প্রিয়কে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেন।

তিনি বলেন, “সেন্ট্রাল রোডের দিকে কেউ একজন একটা দেহ টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, সাহায্যের জন্য ডাকছিল। সাহস করে এগিয়ে যেতেই দেখি লোকটির মাথা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। নিথর দেহটা প্রিয় ভাইয়ের, যিনি মাত্র দুই মিনিট আগেই বলেছিলেন—একসাথে থাকি।”

তিনি জানান, “প্রিয় ভাইয়ের কাছে যেতেই আবার গুলি শুরু হলো। আমি তখন সত্যি দৌড় দিলাম। পেছনে ফিরে দেখি ভাইয়া রাস্তায় পড়ে আছে, একা। কিন্তু আর কিছুই করতে পারিনি।”

তবে প্রিয়’র মৃত্যু মুহূর্তে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে সংবাদ ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল গোটা দেশ।

তাই মৃত্যুর খবর অনেকেই জানতে পারেননি। দীর্ঘদিন যারা প্রিয়’র ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাদের অনেকেই শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেননি।

বন্ধু মেহেরুন নাহার মেঘলা বলেন, “আজ পাঁচদিন পর জানতে পারলাম—প্রিয় আর নাই।”

তিনি আরও জানান, “ওরা তিনজন একসাথে ছিল। একজনের পাশ ঘেঁষে গুলি গিয়ে প্রিয়’র মাথায় লাগে। লাশ পড়ে থাকে, কেউ উদ্ধার করতে পারেনি। পরে দুই দিন পর গিয়ে পরিবার মরদেহ বুঝে পায়।”

প্রিয় রেখে গেছেন মাত্র ছয় বছর বয়সী কন্যাসন্তান পদ্মপ্রিয় পারমিতাকে। বন্ধুরা জানান, সদ্য একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হয়েছিল সে। “প্রিয়-ই ওর মা-বাবা ছিল,” বললেন মেঘলা।

'বুলেট পর্যন্ত বের করা হয়নি'

প্রিয়’র মৃত্যুর ঠিক দুই দিন আগে, ১৮ জুলাই, কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে মারা যান ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের (ডিআরএমসি) ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ।

পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে তাকে নেওয়া হয়েছিল রাজধানীর সিটি হাসপাতালে।

ফাইয়াজের বন্ধু জানান, “আমি কাছেই ছিলাম। হঠাৎ শুনি ওর গুলি লাগছে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা গুলি বের করেননি। অনেকে বলছিল এটা রাবার বুলেট ছিল।”

এই ঘটনায় আরও এক বিষাদময় অধ্যায় যোগ হয় ফাইয়াজের দাফন নিয়েও। বন্ধুরা জানায়, জানাজার আয়োজন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

“ক্যাম্পাসে জানাজার অনুমতি দিতে চাচ্ছিল না ডিআরএমসি কর্তৃপক্ষ। হয়তো উপরমহল থেকে চাপ ছিল,” বললেন ফাইয়াজের এক বন্ধু।

'একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি'

টঙ্গী সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ নিহত হন ১৯ জুলাই, শুক্রবার। দুপুরে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।

তার বড় বোন শিমু আহমেদ ফেসবুকে লিখেছেন, “আমার ভাইকে মাথায় গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। আমাদের হাসিখুশি পরিবার এক সেকেন্ডেই শেষ হয়ে গেলো।”

মাত্র ১০ ঘণ্টা আগে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আরও বলেন, “একটা দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আমার একমাত্র ছোট ভাই, আমার আম্মুর জান, আর নেই।”

রিয়াদের বন্ধু তাসনিম জামান শোকবার্তায় লিখেছেন, “আজ ছয় দিন হতে চললো, তুই নেই। এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তুই আর কোনোদিন আমাদের কাছে ফিরে আসবি না।”

রিয়াদ, প্রিয় কিংবা ফাইয়াজ—তারা শুধু তিনটি নাম নয়। তাদের মতোই আরও বহু মানুষ জীবন হারিয়েছেন চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে। এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে—এদের কেউ শিক্ষার্থী, কেউ সাংবাদিক, কেউ বা নিরীহ পথচারী।

এছাড়া কয়েক হাজার মানুষ আন্দোলনের মিছিলে-পাল্টা দমন-পীড়নের মুখে আহত হয়েছেন।

এই আন্দোলন কেবল একটি দাবির প্রশ্ন নয়, তা হয়ে উঠেছে বহু পরিবারের বেদনার গল্প—চিরতরে বদলে যাওয়া জীবনের করুণ প্রেক্ষাপট।


No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.