Header Ads

Header ADS

বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার

বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার

বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার: নির্বাচন ও নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার দিন দিন বাড়ছে এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ছড়িয়ে পড়ছে, যা রাজনৈতিক নেতা, নারী প্রার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মানহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রযুক্তির অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে নারী নেতাদের বিরুদ্ধে, যাদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হচ্ছে ডিপফেক ভিডিও ও কল্পিত অডিও। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই ৭৬ শতাংশ ডিজিটাল সহিংসতার শিকার ছিলেন নারী, যাদের অনেকেই রাজনীতিতে সক্রিয়।

নির্বাচন সামনে রেখে বিভ্রান্তি ছড়ানোর শঙ্কা

২০২৫ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এআই-চালিত বিভ্রান্তিমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর আশঙ্কা বেড়েই চলেছে। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ডিসমিসল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, জুন ও জুলাই মাসে প্রায় ৭০টিরও বেশি এআই-নির্ভর রাজনৈতিক ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, যেগুলোতে ২৩ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক রয়েছে। এসব কনটেন্টে নানা চরিত্রে অভিনয় করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো। রিউমার স্ক্যানার নিশ্চিত করেছে, এই ভিডিওগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া এবং এআই টুল ব্যবহার করে তৈরি। ভিডিওতে বানান ভুল, ভবনের গঠন বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মিলহীন—যা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে এবং ভুল তথ্য বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে।

সরকারের অবস্থান ও সীমাবদ্ধতা

এআইর অপব্যবহার ঠেকাতে এখনো বাংলাদেশ সরকার কার্যকর কোনো নীতিমালা বা পদক্ষেপ নেয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে কিছু নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, “ফেসবুক বা ইউটিউব সরকারের সব অনুরোধ মানে না, আর আমরা তেমন জোরালো অনুরোধও করছি না।”

তিনি আরও বলেন, “ডিজিটাল লিটারেসির অভাবের কারণেই সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্তিকর কনটেন্টে বিশ্বাস করে ফেলছে।”

প্রযুক্তিবিদদের মতামত ও করণীয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, বিভ্রান্তি ঠেকাতে চাই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি ভিজিল্যান্স টিম, উন্নত মনিটরিং সিস্টেম এবং কার্যকর নীতিমালা। তিনি বলেন, “যারা প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে, তাদের শনাক্ত করতে নজরদারি দল থাকতে হবে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।”

লন্ডনভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রধান প্রকৌশলী শামীম সরকার বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে, তাতে নির্বাচনের আগে এ ধরনের কনটেন্ট কয়েকশ গুণ বাড়বে। নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিশেষভাবে এসব অপপ্রচার চালানো হবে।”

বিপজ্জনক বাস্তবতা: সহজলভ্য টুলে তৈরি বিভ্রান্তি

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ২৪ ডলারে কেনা সহজলভ্য এআই টুল—যেমন হেযেন, ডিপফেইসল্যাব, সিনথেটিক ইত্যাদি ব্যবহার করে যে কেউ তৈরি করতে পারছে বাস্তবসম্মত ভুয়া ছবি, ভিডিও এবং ভয়েজ। এইসব কনটেন্ট এতটাই বিশ্বাসযোগ্যভাবে তৈরি হচ্ছে যে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারছে না।

আইন ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের অভাব

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এআই-সৃষ্ট ভুয়া কনটেন্ট প্রতিরোধে কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো গাইডলাইন তৈরি করেনি। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই কনটেন্টগুলো সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে জনমত প্রভাবিত করতে পারে।

শামীম সরকার বলেন, “ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স-এর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এখনই বসা উচিত। যেমন হংকংয়ে কনটেন্ট প্রমোশনে নিয়ন্ত্রণ আছে, আমাদের এখানেও সে রকম ব্যবস্থা জরুরি।”

নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবিত উপায়

প্রযুক্তিবিদদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন:

  1. আইন প্রণয়ন: এআই-চালিত ভুয়া কনটেন্টকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা।
  2. মনিটরিং সেল: একটি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি দল গঠন।
  3. সোশ্যাল মিডিয়া সমন্বয়: ফেসবুক, ইউটিউব, মেটা ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমঝোতা করে গাইডলাইন তৈরি।
  4. ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার: জনগণের মধ্যে মিডিয়া ও তথ্য সচেতনতা বৃদ্ধি।
  5. ফ্যাক্ট-চেকিং শক্তিশালী করা: দ্রুত সত্য যাচাই ও বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য স্থানীয় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো।



কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন সম্ভাবনা, অন্যদিকে তা এখন এক ভয়াবহ বিভ্রান্তির অস্ত্র হয়ে উঠছে। নির্বাচন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এআইর অপব্যবহার এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে তা হয়ে উঠতে পারে গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তাই এখনই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতা—যাতে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ডিজিটাল বাংলাদেশকে সত্যিকারের নিরাপদ রাখা যায়।

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.