কোটা সংস্কার আন্দোলনের আরেক নাম আবু সাঈদ
১৬ জুলাই—বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত দিন। সারাদেশজুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষে প্রাণ হারান অন্তত ছয়জন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষার্থী, পথচারী ও রাজনৈতিক কর্মী। এ দিন রূপ নেয় এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে।
সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসেন শিক্ষার্থীরা। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির বাইরে গিয়ে তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশালসহ নানা শহরের সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
সড়কজুড়ে পড়ে ছিল ইটের টুকরো, লাঠিসোঁটা, ছিন্নভিন্ন জুতা-স্যান্ডেল—সবই সাক্ষ্য দেয় পুলিশের তাণ্ডব ও আন্দোলনকারীদের পিছু হটার দৃশ্যপটের। কিন্তু এই ভয়াবহতার মাঝেও এক তরুণ এগিয়ে এসেছিলেন বুক পেতে দিয়ে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আবু সাঈদ দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন পুলিশের গুলির সামনে। তাঁর দুই হাত প্রসারিত, বুক উন্মুক্ত। পুলিশ ছররা গুলি ছোড়ে, যা বিদ্ধ করে তার দেহ। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ২২ বছর বয়সী এই সাহসী তরুণ মৃত্যুবরণ করেন।
পূর্বদিন, ১৫ জুলাই থেকেই আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। তবে ১৬ জুলাইয়ের সহিংসতা ছাড়িয়ে যায় আগের সব রেকর্ড। পুলিশ, ছাত্রলীগ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে ঢাকাসহ রংপুর ও চট্টগ্রামে নিহত হন ছয়জন, আহত হন এক হাজারের বেশি।
প্রধান ঘটনাপ্রবাহ:
ঢাকা:- রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন কয়েকজন।
- ঢাকা কলেজের সামনে হকার মোহাম্মদ শাহজাহান (২৫) নিহত হন।
- সিটি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় মারা যান আরেক তরুণ, মো. মনির।
- কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় প্রক্টরিয়াল টিম বহিরাগতদের সরে যেতে বললে শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানে তাদের ওপর হামলা চালান। আহত হন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল মুহিত।
- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
- এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালালে আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
- সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন।
- নিহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ও ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম (২৩), মো. ফারুক ও ফিরোজ আহমেদ (২৪) রয়েছেন।
- ছাত্রলীগ কর্মীদের বহুতল ভবন থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যার জন্য ছাত্রদল ও শিবিরকে দায়ী করা হয়।
- কুমিল্লায় পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর
- বগুড়ায় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর ও আওয়ামী লীগ অফিসে অগ্নিসংযোগ
- রাজপথে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিজিবি মোতায়েন করা হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া ও গাজীপুরে।
প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ:
-
শহীদদের স্মরণে কর্মসূচি:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নিহতদের স্মরণে ১৭ জুলাই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের ডাক দেয়। -
কলেজ শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা:
- ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব এলাকায় এবং
- নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা মতিঝিলে সড়ক অবরোধ করেন।
- খুলনাসহ দেশব্যাপী কলেজ শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন।
- প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের হাইকোর্ট রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।
- গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে ছাত্রলীগের দেড় শতাধিক নেতাকর্মী পদত্যাগ করেন।
ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের অধিভুক্ত কলেজগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।
- ১৭ জুলাইয়ের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ ছিল আন্দোলনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। তাঁর মৃত্যু দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার মধ্যে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়। আন্দোলন স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলে রূপ নেয়, যার ফলেই মাত্র ২০ দিনের মধ্যে—৫ আগস্টে পতন ঘটে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের। ১৬ জুলাই তাই শুধু একটি আন্দোলনের দিন নয়, এটি এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনেরও সূচনাবিন্দু।

No comments
ধন্যবাদ।