২০ জুলাই দুপুরে গাজীপুরে শহীদ হন
শহীদ রায়হান আলী: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি করুণ অধ্যায়
২০২৪ সালের ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রায়হান আলী (১৮)। তিনি নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার পানিশাইল গ্রামের মামুন সরদারের পুত্র ছিলেন। রায়হানের মৃত্যু আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের সূচনা করে এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিরোধ আরও দৃঢ় করে তোলে।
গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ
ওই দিন দুপুরে গাজীপুর মেট্রোপলিটনের গাছা থানার কলমেশ্বর বোর্ডবাজার এলাকার বেলমন্ট টেইলার্সের সামনে রায়হান আলী গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
পারিবারিক পটভূমি
রায়হানের বাবা মামুন সরদার জীবিকার তাগিদে ২০১৭ সালে ঢাকায় পাড়ি জমান এবং সেখানে গার্মেন্টসে চাকরি নেন। তার স্ত্রী রানী বেগমও একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন। পরে তারা ঢাকার গাজীপুরে কলমেশ্বর গ্রামে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। সে সময় তাদের কন্যা তাছলিমার জন্ম হয়, বর্তমানে সে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী।
ঢাকা থেকে ফিরে মামুন সরদার রিকশা চালিয়ে এবং রানী বেগম সেলাইয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। রায়হান ভর্তি হন বরেন্দ্র আলীয়া মাদ্রাসায় এবং সেখান থেকে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আন্দোলনের সময় তার জীবন থেমে যায়।
আন্দোলনে মৃত্যু ও আইনি পদক্ষেপ
রায়হানের বাবা মামুন সরদার গত ১০ অক্টোবর গাছা থানায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারসহ মোট ১৬৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে দাফনের ১৩৩ দিন পর, ১ ডিসেম্বর রায়হানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
মা-বাবার আর্তি ও সহানুভূতি
রায়হানের মা রানী বেগম বলেন, “আমার ছেলে স্বপ্ন দেখেছিল দেশ গড়বে। শেখ হাসিনা তাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। তার বিচার চাই।” তিনি জানান, পরিবারটি এখন পর্যন্ত ১৭ লাখ টাকা পেয়েছে, যার মধ্যে ১০ লাখ সঞ্চয়পত্র, ৫ লাখ দিয়ে জমি বন্ধক, এবং কিছু টাকা দিয়ে রিকশা কেনা হয়েছে। তবে এখনও তারা সরকারি জমিতে বসবাস করছেন।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
রায়হানের মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আতিকুর রহমান বলেন, “রায়হান শুধু নওগাঁর নয়, পুরো দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। আমরা আজ যে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পারছি, তা এসব শহীদদের আত্মত্যাগের ফল।”
সরকারপ্রদত্ত সহায়তা
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল জানান, রায়হানসহ গণঅভ্যুত্থনে নিহত ৮ শহীদের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হয়েছে এবং আগেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
শহীদ রায়হান আলী আজ শুধু একটি নাম নয়, একটি প্রজন্মের প্রতিবাদের প্রতীক। তার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

No comments
ধন্যবাদ।