ফিরে দেখা রক্তাক্ত ১৪ জুলাই : কোটা সংস্কার আন্দোলন
রক্তাক্ত ১৪ জুলাই: বেরোবি শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা
গত বছরের ১৪ জুলাই চীন সফর শেষে দেশে ফিরে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বংশধর’ বলে মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মতো, শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীরাও সেই প্রতিবাদের ঢেউয়ে সামিল হন।
সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি টেলিভিশনের কয়েকজন সাংবাদিক আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্ন তোলেন। একজন টিভি সাংবাদিক প্রশ্ন না করে মতামত দেন—“যারা কোটায় চাকরি পান, তারা মেধাবী নন—এমন ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে।” এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “অবশ্যই যুক্তিযোদ্ধার সন্তানকেই চাকরি দেওয়া উচিত।” একপর্যায়ে তিনি বলে ওঠেন, “যত রাজাকারের বাচ্চারা, নাতি-নাতনিরা, তারাই মেধাবী আর মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা মেধাবী না—এই ধারণাটা কেন?”
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ ছাত্র-জনতার মাঝে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যার পর থেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন। রাত যত গভীর হয়, ততই বিস্ফোরিত হয় এই ক্ষোভ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা হল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। ছাত্রলীগ তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। খুব দ্রুতই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা নিয়ন্ত্রণ নেয়।
স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মতো
সেই রাতে পুরো ক্যাম্পাস মুখরিত হয়ে ওঠে স্লোগানে:
“তুমি কে আমি কে, রাজাকার-রাজাকার”,
“কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার-স্বৈরাচার”,
“চাইতে এলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার”।
এই আন্দোলনের আগুন শুধু ঢাকা নয়, ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। যেই আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছিল, সেটি প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর আবারও জ্বলে ওঠে আগুনের ফুলকির মতো। এদিন রাত থেকেই ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুরসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন।
১৪ জুলাই রাতেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া থেকে মিছিল শুরু হয়ে যায় টিএসসির দিকে। ছাত্রলীগের বাধা পেরিয়ে একের পর এক ব্যারিকেড ভেঙে আন্দোলনকারীরা এগিয়ে যেতে থাকেন। সেই রাতে বিভিন্ন হলের ছাত্রীদেরও অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা হল গেটের তালা ভেঙে রাস্তায় নামেন।
স্মারকলিপি, পদযাত্রা ও ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম
পরদিন, ১৫ জুলাই দুপুরে ঢাকার কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে শুরু হয় রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে গণপদযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। টিএসসি, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব হয়ে মিছিল সচিবালয় ও গুলিস্তান পর্যন্ত অগ্রসর হয়। পথে বারবার ব্যারিকেড দিলেও শিক্ষার্থীরা তা ভেঙে এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত হাজারো শিক্ষার্থী বঙ্গভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।
সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির দপ্তরে স্মারকলিপি পেশ করে। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় সংসদের জরুরি অধিবেশন ডেকে কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে স্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের জন্য আরও ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল—সর্বত্র ছাত্রদের পদযাত্রা
একই সময়ে দেশের অন্যান্য শহরেও চলতে থাকে স্মারকলিপি প্রদান ও গণপদযাত্রা।
- চট্টগ্রামে ষোলশহর স্টেশন থেকে পদযাত্রা করে শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান।
- ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পদযাত্রা শেষে স্মারকলিপি দেন।
- বরিশালে বিএম কলেজ, ববি, সিটি কলেজ, পলিটেকনিকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পৃথক মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।
আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়
১৪ জুলাইয়ের এই ঘটনা কোটাবিরোধী আন্দোলনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হয়ে দাঁড়ায়। যেই আন্দোলন আইন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নিষ্পত্তির পথে ছিল, প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত বক্তব্যে তা আবারও দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই শুরু হয় সরকারি দমন-পীড়ন, যার মোকাবিলায় শিক্ষার্থীরা গড়ে তোলেন শক্তিশালী প্রতিরোধ।
সেদিন রাতেই বেরোবির বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। বিজয় ২৪ হল (সাবেক বঙ্গবন্ধু হল), শহীদ মুখতার ইলাহী হল এবং শহীদ ফেলানী হল (সাবেক বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল) থেকে স্লোগান দিতে দিতে শিক্ষার্থীরা বের হন। অনেক ছাত্রী হলের তালা ভেঙে আন্দোলনে অংশ নেন এবং শহরের মর্ডান মোড়ে গিয়ে অবস্থান নেন। মিছিলটি শহরের দর্শনা, লালবাগ, পার্ক মোড় হয়ে আবারও মর্ডান মোড়ে ফিরে আসে। শুধু বেরোবির নয়, সেদিন রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এই মিছিলে যোগ দেন।
রাত ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা মিছিল শেষে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন। ছাত্ররা মেয়েদের হলে পৌঁছে দিয়ে নিজ নিজ আবাসস্থলে ফিরছিলেন। ঠিক সেই সময়ই লাইব্রেরি সংলগ্ন এলাকায় ওঁৎ পেতে থাকা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র ও ইটপাটকেল নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। শিক্ষার্থীরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ফলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। হামলায় দুইজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন এবং তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এটাই ছিল বেরোবি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের প্রথম রক্তাক্ত হওয়া।
আহতদের একজন, সাংবাদিক তাওহিদুল হক সিয়াম সেই রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে স্মরণ করে বলেন,
“আমরা যখন মিছিল শেষে হলের দিকে ফিরছিলাম, তখন লাইব্রেরির সামনে পৌঁছালে ছাত্রলীগ আমাদের উদ্দেশে উসকানিমূলক স্লোগান দেয়। আমরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে প্রতিক্রিয়া জানালে তারা আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমাদের দুইজন গুরুতর আহত হন, কিন্তু আজও তাদের সেই ঘটনার বিচার মেলেনি।”
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আহসান হাবিব বলেন,
“১৪ জুলাই শেখ হাসিনা যখন আমাদের রাজাকার বলে আখ্যায়িত করেন, তখনই সারাদেশের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। আমরা বেরোবি শিক্ষার্থীরাও শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা করি। কিন্তু মেয়েদের হলে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে ছাত্রলীগ আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়। তাদের হাতে আমাদের অনেকেই আহত হয়। এ হামলা ছিল পরিকল্পিত, ছিল সন্ত্রাসী কায়দায়। দুঃখজনকভাবে, আজও সেই হামলার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার হয়নি।”
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৪ জুলাই পরিণত হয় বেরোবির শিক্ষার্থীদের জন্য এক রক্তাক্ত, স্মরণীয় এবং প্রতিবাদের প্রতীকে।

No comments
ধন্যবাদ।