Header Ads

Header ADS

শিশুদের হাতে নিম্নমানের বই

বই

চলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের মাঝে ৪০ কোটির বেশি বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে। তবে বইগুলো দরপত্রে নির্ধারিত মান অনুযায়ী ছাপা হয়নি—এমন অভিযোগে সরকার দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এর নেতৃত্বে দুটি পরিদর্শন সংস্থা ও দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ৩২টি দল দেশের ৬৪ জেলায় অভিযান চালায়। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৮ কোটি বই নিম্নমানের হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।

অভিযানের পেছনের প্রেক্ষাপট

এনসিটিবির একটি সূত্র জানায়, কঠোর নজরদারির পরও নিম্নমানের বই সরবরাহের তথ্য পেয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার এনসিটিবিকে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালানোর নির্দেশ দেন। গত এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া অভিযানে এনসিটিবির কর্মকর্তারা জেলার মফস্বল অঞ্চল থেকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বই সংগ্রহ করেন। বইগুলোর মান যাচাইয়ের জন্য সেগুলো পাঠানো হয় বিসিএসআইআর, বুয়েট ও বিএসটিআই-এর ল্যাবে। পাশাপাশি হাইটেক সার্ভে বিডি নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে দুটি গোয়েন্দা সংস্থাও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় নমুনা সংগ্রহ করে।

কীভাবে যাচাই করা হয় বইয়ের মান

পরিদর্শন টিমগুলো বইয়ের কাগজের জিএসএম, ব্রাইটনেস, কভার পেজে ব্যবহৃত আর্ট কার্ড, মুদ্রণ, বাঁধাই ও ছবির মান যাচাই করেছে। হাইটেক সার্ভে এবং টিম সদস্যদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংগ্রহকৃত বইয়ের প্রায় ২০ শতাংশ নিম্নমানের পাওয়া গেছে। সে হিসাবে, ৪০ কোটির মধ্যে ৮ কোটি বই মানদণ্ড অনুযায়ী হয়নি।

অভিযানে বাধা এবং প্রশাসনিক চাপ

সূত্র জানায়, অভিযানের শুরুতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান এই অভিযান থামাতে তৎপর হন। ১৭ এপ্রিল টিম গঠনের চিঠি জারি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বাতিল করা হয়। পরে উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে ২৩ এপ্রিল আবার অভিযান শুরু হয়।

তদারকির ঘাটতি ও প্রিন্টার্সদের অনিয়ম

চলতি বছর বই ছাপার আগে ও পরে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য এনসিটিবি ‘প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই)’ এবং ‘পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন (পিএলআই)’ এজেন্সি নিয়োগ করে। কিন্তু বাস্তবে পিডিআই দায়িত্বে থাকা ‘ব্লু বাইন্ডার্স’ নামক প্রতিষ্ঠানটি জনবল সংকটে ভুগছিল। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও ছিল না। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি কালো তালিকাভুক্তও ছিল। দরপত্রে ছয় নম্বর অবস্থানে থেকেও তৎকালীন চেয়ারম্যানের ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠানটি কাজ পায়। ফলে মাধ্যমিক স্তরের বইগুলোর মান সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

মন্ত্রণালয়ের তদারকি ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা

এবার এনসিটিবির নিজস্ব কর্মকর্তাদের পাশাপাশি শিক্ষা ক্যাডারের ১৫০ জন কর্মকর্তা, দুটি গোয়েন্দা সংস্থা ও দুটি পরিদর্শন সংস্থা মাঠে কাজ করেছে। এনসিটিবির সচিব অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিন বলেন, তারা মফস্বলের স্কুল থেকে বই সংগ্রহ করেছেন, কারণ সাধারণত সদর জেলাগুলোতে ভালো মানের বই সরবরাহ করা হয়।

অর্থনৈতিক ক্ষতি ও দায়-দায়িত্ব

৫ আগস্টের পর পূর্ববর্তী দরপত্র বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বান করায় বইয়ের ছাপা খরচ গড়ে ২০ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে সরকারের অতিরিক্ত ৮০০ কোটি টাকার ব্যয় হয়। তদারকি এজেন্সির অদক্ষতা ও দায়িত্বে অবহেলা, বিশেষ করে শেষ ধাপে, নিম্নমানের বই বিতরণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়।

অনিয়মের প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া

নিম্নমানের বই সরবরাহের প্রতিবাদে এনসিটিবির এক সদস্য পাঁচটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিল আটকে দেন এবং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেন। এর পরপরই তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়, যা বাকিদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করে।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির মত

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, “সরকারের এত সংস্থা ও পর্যবেক্ষণ থাকার পরও যদি নিম্নমানের বই সরবরাহ হয়, তাহলে বুঝতে হবে—সর্ষের মধ্যেই ভূত আছে।”

এবারের অভিযান স্পষ্ট করেছে যে, কঠোর তদারকির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বইয়ের গুণগত মান রক্ষায় দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা, সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার করা জরুরি।

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.