Header Ads

Header ADS

গল্প-উপন্যাস: নতুনে ভয়

 

কারওয়ান বাজারের সবজিপট্টির পেছনে, ঠিক যেখানে শহরের কোলাহল ফুরায়, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে রেললাইন। বিকেল হলেই সেখানে কিছু ছায়ামানুষের আনাগোনা শুরু হয়। তারা লোকজন দেখলেই তাকায় ভাঙা চোখে, কখনো হঠাৎ মুখ তুলে বলে, "লাগবে নাকি?"

যাদের লাগার, তারা প্রশ্ন করে না। একে-বারে কাছে এসে হাত বাড়ায়, টাকা বাড়ায়। কাগজে মোড়ানো পুঁটলি চুপচাপ হাতবদল হয়। কখনো শুধু শোনা যায়, “একের মাল একের!”

মন্তাজ ঠিক সন্ধ্যার সময় সেখানে আসে, প্রতিদিন। ট্রাকস্ট্যান্ড পেরিয়ে তার ভাঙা রিকশাটা ঠেলে আনে, শরীরের শেষ রক্তটুকু পায়ে নামিয়ে। সকাল পাঁচটা থেকে শুরু হওয়া রিকশা চালানোয় তার পায়ের গোড়ালি যেন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকে। দিনের শেষে পকেটে যেমন ৩০, ৫০, ৬০ টাকা জমে, তেমনি শরীর থেকে বেরিয়ে যায় ইচ্ছা, স্বপ্ন আর শক্তি। মানুষকে কবি যেভাবে “হাওয়ার গাড়ি” বলেছে, মন্তাজ যেন তার প্রমাণ।

দুপুরে সে খায় ছাপড়া হোটেলে—আলুভর্তা, পাতলা ডাল আর ভাত—ত্রিশ টাকায়। কখনো নূরজা বেগমের মেজাজ ভালো থাকলে লালশাকও জোটে। লালশাক মেখে খেতে খেতে মনে পড়ে তার মায়ের কথা। তিন বছর বয়স পর্যন্ত মা খাইয়েছিল। তারপর এক অসুখে মরে যায় আকিমুন বিবি। তবু সেই ছোট্ট তিন বছরের স্মৃতি মাথায় জ্বলজ্বল করে।

মন্তাজ সবচেয়ে বেশি হতাশ হয় দুপুরেই—একটু থামে, নূরজার সঙ্গে দু-চার কথা হয়। হোটেলের কোণে হিন্দি সিনেমা চলে, আলিয়া ভাট নাচে আর মন্তাজ হাসে—“শালার নাইকা! হাড্ডি ছাড়া শরীর নাই!”
নূরজা বলে, “এইটাই এখন হিট! সব নাইকাই হাড্ডি এখন!”
আর তখনই মন্তাজ তার দিকে আড়চোখে তাকায়—নূরজার থলথলে শরীর, ঘামের গন্ধ, গলার নাকফুল, সোনার দুল, কমরটা ধরতে দুই হাত লাগে! আহ্!

“আর ভাত দেব?”
চমক ভাঙে মন্তাজের, কিন্তু ঘোর ভাঙে না। বলে, “তুমি ওই আলিয়ার চেয়েও বড় নাইকা!”

নূরজা খেপে গিয়ে ভাতের হাতা ছুড়ে দেয়—লেগে যায় কপালে। তারপরেই আবার এসে জড়িয়ে ধরে। সেই সন্ধ্যায় রেললাইন আর লাগে না মন্তাজের।

তবু পরের দিনগুলোয় লাগে।

সারা দিনের রিকশা টানার পর তার শরীর বিষিয়ে থাকে। সেই বিষে গাঁজা ঢালতে হয়। সস্তা সিগারেটের ফিল্টার খুলে তাতে গাঁজা গুঁজে আগুন ধরায়। ধোঁয়া যখন বুক ভরে ওঠে, তখন মনে হয় সে এখনো বেঁচে আছে। মনে পড়ে, নূরজা তাকে মেরে জড়িয়ে ধরেছিল… কেঁদেছিলও।

কিন্তু সেই ঘটনার পর, আলিফার দিকে তাকাতে কেমন অস্বস্তি লাগে মন্তাজের। কিশোরী, শুকনো গড়ন, যেন বাতাসেই উড়ে যাবে। অথচ বিয়ে করেছিল সে এই মেয়েকে সাত মাস আগে। ভাবি বলেছিল, “পানি পড়লেই শরীরে গোশত আসবে।” তা তো হয়নি! বরং মেয়েটা আরও শুকিয়ে গেছে।

নূরজা শুধু ভাতই নয়, পরামর্শও দেয়। বলে, “শরীর সইতেছে না! ভালোমন্দ খাও।”
মন্তাজ হাসে—হলুদ দাঁতের কিম্ভূত হাসি।
“খাও কই থেকে? মন্দই খাইতাছি!”

নূরজা বলে, “তুমি আয়নায় নিজেকে দেখো! হিরোঞ্চির মতো লাগো।”
“তওবা! গাঁজা খাই, হিরোইন না।”
“ওটাও একদিন ধরা দেবে। তখন মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।”

মাটির কথা শুনে কেমন করে মন্তাজ। মা, বাবা, চাচার মাটি হওয়ার স্মৃতি মনে পড়ে। সে মাটিতে যেতে চায় না।

নূরজার ঘামে ভেজা শরীর আর কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে মন্তাজ।
সে বলে, “তুমার হোটেলে চাকরি দাও।”
“চাকরি না, বুদ্ধি দিতাছি—অটো চালাও। কষ্ট কম, কাম বেশি!”

মন্তাজ দ্বিধায় পড়ে—চান্দা, টিকিট, ঝামেলা…
নূরজা সরাসরি বলে, “তুমি আসলে নতুনে ভয় পাও।”

মন্তাজ থমকে যায়। সত্যিই কি তাই? সেই রাতে সে আলিফার শুকনো গায়ে বিরক্ত হয়। বিছানায় কঙ্কাল শুয়ে আছে। উঠে বিড়ি ধরায়। পায়ে আবার সেই টান। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়।

পরদিন গ্যারেজে যায় রইসু মিয়ার কাছে—নূরজার পরিচিত। রইসু মিয়া হাসতে হাসতে অভ্যর্থনা করে।
“এই নাও অটো। চালাও।”

নতুন অটোর রূপ দেখে ধক করে ওঠে মন্তাজের বুক। পুরোনো হাড্ডিসার রিকশা আর এই চকচকে অটো—দুই জগত।
“চালাতে পারবা?”
মন্তাজ চুপ থাকে।
“চিন্তা কইরো না, একবার শিখলে ভুলা যায় না।”

চাবি হাতে নেয় মন্তাজ। চালাতে শুরু করে।

দুই ঘণ্টার মাথায় তিনটা ভাড়া মেরে ফেলে। পায়ে ব্যথা নেই, শরীরে ক্লান্তি নেই। এমনকি একটা প্রেমের গানও গুনগুনায়—
“তোমাকে চাই শুধু আমি, আর কিছু জীবনে পাই বা না পাই…”

কারওয়ান বাজারে গাঁজার টান মারতে গেলেও আগের সেই ক্লান্তি আর লাগে না।

তিন সপ্তাহ পর একদিন নূরজা বলে, “তোমার খাওয়ার পরিমাণ কমে গেছে!”
মন্তাজ বলে, “কষ্ট কম, তাই ক্ষুধাও কম।”

নূরজা হাসে, হাসিতে শরীর কাঁপে। সেই হাসি দেখে মন্তাজের অদ্ভুত লাগে। এত গোশত! এত গন্ধ! নাক কুঁচকে যায়। আচমকাই ভাতে বমি করে দেয়।

নূরজা ছুটে আসে, কিন্তু মন্তাজ আর কাছে যেতে দেয় না।

রাতে আলিফাকে টেনে নেয় বুকে। এখন তাকে আলিয়ার মতো লাগে।

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.