জীবন কতটা অনিশ্চিত আমাদের
এইতো নোয়াখালী তৃতীয় ধাপে ত্রাণ দিতে যাওয়ার সময় আমরা মোট ১২ জন ছিলাম, এর মধ্যে মোস্ট সিনিয়র দুজন ( পলাশ ভাই,সাদমান ভাই ) বাকি ১০ জন আমারা ওনাদের জুনিয়র ছিলাম।
রাতের জার্নি, তাই ওনাদের দুজনকে সামনে বসতে দিলাম আর আমরা বাকি ১০ জন পিছনেই ত্রাণের পাশে যে টুকু জায়গা ছিলো ওইটুকুতে বসলাম,
সীতাকুণ্ডে পেট্রোল পাম্পে গাড়ি থামালে ভাই সামনের সিট থেকে বের হয়ে আমাদের এখানে আসে,কিছুক্ষণ হাসিতামাশা হয় আমাদের সাথে ভাইয়ের,ওনি ওনার ফোন দিয়ে সেলফি তুলেন সবার সাথে,তখন বলতেছিলো কারো বেশি ঘুম পেলে সামনে চলে যাওয়ার জন্য,ওনি পিছনে আসবে,যেহেতু সিনিয়র আর সাদমান ভাইও সামনে আছেন,ওনাকেই আমরা সামনে পাঠায়...
এর কিছুক্ষণ পরেই তো যা হওয়ার হলো,আমাদের সবার চোখেই ঘুম ঘুম ভাব, হালকা করে সবাই ঝিমুচ্ছিলাম,হঠাৎই বড় এক ধাক্কা 🙂
দেখলাম আমাদের পিছন থেকে কাইকোবাদ (৫৩ ব্যাচ) ও নাই গাড়িতে,হঠাৎ কে জানি বলে উঠলো কাইকোবাদ কোথায়.?
উঠে বামে তাকাই দেখি ও রাস্তার মাঝে পরে আছে,যে যে পারছি লাফ দিয়ে নিছে নেমে ওকে রাস্তার মাঝে থেকে নিয়ে আসি,এই কয়েক সেকেন্ডেও আমার মাথায় আসেনি যে সামনে এতো বড় এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে🙂
এর কয়েক সেকেন্ড পরে সামনের দিকে তাকাই দেখি গাড়ির এই অবস্থা আর পলাশ ভাইয়ের চিৎকার 🙂
দৌড়ে গেলাম,দেখি কোমরের নিচের পুরোটা আটকানো আর চিৎকার করে বলতেছিলো বার বার যে ওনাকে বের করতে তারাতারি,ওনি আর পারতেছেনাহ, আরো কত কিছু🙂(আহারে আর্তনাদ আহাজারি ভাই ওই কথা গুলো কখনোই ভুলবো নাহ )
আমরা যে কয়েকজন দাঁড়ানো ছিলাম ট্রাই করতেছিলাম কিন্তু কোনো ভাবেই পারতেছিলাম নাহ, ভাইকে যে কতো ধরনের স্বান্তনা দিয়েছিলাম ওই সময় টুকুতে,ভাই শুধু বলতেছিলো ওনাকে বের করে হাসপাতাল নিয়ে যেতে,পরে আরো দুইটা গাড়ি থামে ওনারাও ট্রায় করতে থাকে,প্রায় ১৫ মিনিট পরে ওনাকে বের করতে পারি। পরে সাকিব আর অপি মিলে ভাইকে ওখানের সদর হসপিটালে নিয়ে যায় ওখানে থেকে অসনঁষধহপব এ করে ঈগঈ তে আর আমি বাকি সিরিয়াস ইনজিওরড ৪ জনকে নিয়ে আরেকটা এম্বুলেন্স করে ঈগঈ তে আসি আর ওখানে ৫৩ ব্যাচের কয়েকটা ছোটা ভাই এর বন্ধু সাইফুর কে রেখে আসি ত্রাণ + পুলিশ এর ব্যাপার গুলো ঠিকঠাক ভাবে কম্পিট করে আসার জন্য।
নিয়ে আসার সময়ও একটাবার মনে হয়নি এমন কিছু হয়ে যাবে,একদম শুরু থেকেই ভাইকে দেখে কোনো ভাবেই মনে হয়নাই মাথায় এমন আঘাত পাইছে,ওনার ব্রেইন একদম নরমালই মনে হয়েছিলো আর কপাল একটু কেটে গেছিলো তা ছাড়া কিছুই চোখে পরেনি ইভেন সারা রাস্তায় কথাবার্তা, চিৎকার করতে করতে ঈগঈ তে আসছিলো।
ঈগঈ তে যে যার মতো আহতদের নিয়ে ছুটাছুটি শুরু করি, পলাশ ভাইয়ের সাথে লাস্ট কথা হয়েছিলো অপারেশন এ যাওয়ার আগে,২ নং ওয়াডে 🙂
ভাই এর চিৎকার শুনে কপালে হাত দিয়ে বলতেছিলাম ভাই কিচ্ছু হবেনাহ,২-৩ মাস লাগবে প্লাসটার করে দেবে,পরেই ভালো হয়ে যাবে🙂
ভাই বার বার বলছিলো যে ওনি আর হাটতে পারবেনাহ আর ওনাকে বুঝাচ্ছিলাম🙂
একটা সময় বলে বাসায় কথা বলবে,সাফিন ভাইয়ের ফোন টা আমাত হাতে তখন,আমাকে পলাশ ভাই আন্টির নাম্বারটা বললে আমি ওই ফোন দিয়ে ওনার কানে ধরি আর ওনি সুন্দর ভাবেই আন্টির সাথে কথা বলে 🙂
কিছুক্ষণ কথা বলার পরে আমাকে বলে যে এভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠেও ব্যাথা লাগছে,পিঠের নিচে কিছু একটা দিয়ে পারলে,আমার কাদে পাভনের একটা গামছা ছিলো, ওইটা দিয়ে দিলাম আমাদের ওইটুকুতে ধন্যবাদ ও জানাইসিলো 🙂🙂
এখানেই ছিলো আমার ভাইয়ের সাথে লাস্ট ভালো করে দেখা আর কথা বলা 🙂
অপারেশন হলো,বিকেলে আবার গিয়ে দেখি তখনো কথা বলতে পারছে,ব্যাথায় কাতরাচ্ছে বার বার,কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই আবার অবস্থার অবনতি, রাতেই ওঈট তে নিয়ে যায়,প্রতিটাবার যখন হাসপাতালে যেতাম, গেইট দিয়ে ঢুকার সময় ভাবতাম এখন গিয়ে যদি ভাইয়ে পজিটিভ কোনো নিউজ পেতাম 🙂
দিন দিন অবস্থার অবনতি,গতরাতের আগের রাতে ঈগঐ (উযধশধ) নিয়ে যায় 🙂
ওঈট তে নেয়ার পরথেকে এতো দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে আজকে ভোরে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন পলাশ ভাই 🙂
ডেপ্টের টিচার,সিনিয়র, ব্যাচমেট, জুনিয়র সবাই সবার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দিয়েছে এই কয়েটা দিন রাত দিন ২৪ ঘন্টাই মিনিমাম ৩-৪ জন করে থাকতোই আমাদের কেউ হাসপাতালে,কেউ হয়তো ভাবেনাই এমন কিছু হয়ে যাবে 🙂
কেনো জানি কোনো ভাবেই নিজের মনকে মানাতে পারছিনাহ যে এতো বড় কিছু হয়ে গেছে, এখনো কানে ভাসছে ভাইয়ের কথা গুলো,ওনার হাসিটা ভাসছে চোখে 🙂
আংকেল, আন্টি আর ওনার ছোট ভাইটাকে কতো মিত্যা সান্ত্বনা যে দিতেছি,কতো করে বলেছি যে ভাইয়ের কিচ্ছু হবে নাহ,ওনি ঠিক আছে অনেকটা 🙂
ভাইয়ের পরিবারের সবাইকে ধৈর্য্য ধারন করার ক্ষমতা দান করোক আর ভাইকে জান্নাত দান করোক আল্লাহ,
সবাই দোয়া করবেন ভাইয়ের জন্য 🤲
No comments
ধন্যবাদ।