কন্যা সন্তান বিক্রেতা আব্দুর রশিদ এবং রোকেয়া!
আব্দুর রশিদ। বয়স ২৯। রশিদের পরিচয়, তিনি পেশায় একজন দিনমজুর। দৈনিক আয় ৪৫০ টাকা।
এর বাইরেও তার আরো একটি পরিচয় আছে। তিনি একজন পিতা। তবে এই পরিচয়টি এখন আর আছে বলা যায় কি-না সেটি বিতর্কের বিষয়!
৪ আগস্ট, স্বৈরাচার পতনের ঠিক ১ দিন আগে ২৩ বছরের সন্তানসম্ভবা স্ত্রী রোকেয়াকে নিয়ে দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালে যান রশিদ। হাসপাতালের বহিঃবিভাগ থেকে টিকিট নেওয়ার আগেই পুলিশের ছোড়া শটগানের গুলি এসে লাগে রশিদের তলপেটে।
টাকার অভাবে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। ৮ আগস্ট আবারও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রশিদকে ভর্তি করা হয় উল্লেখিত হাসপাতালে।
অন্যদিকে স্ত্রী রোকেয়ার প্রসবের সময়ও এগিয়ে আসে। ৮ আগস্টই প্রতিবেশীরা তাৎক্ষণিক চাঁদা তুলে রশিদকে দিনাজপুরের এম আবদুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। পরদিন ৯ আগস্ট অস্ত্রোপচার হয় তার। একই দিনে ফুটফুটে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন রোকেয়া।
কিন্তু কন্যাসন্তানের মুখ আর দেখা হয়নি পিতা রশিদের। হাসপাতালের বিল জোগাড় করতে গিয়ে স্ত্রী রোকেয়া, ৭২ ঘন্টা বয়সী ফুটফুটে কোলের চাঁদকে ৩৭,০০০ টাকায় বিক্রি করে দেন নিঃসন্তান এক দম্পতির কাছে।
একজন মানুষের জীবনের দাম ৩৭,০০০ টাকা! ৯ মাস গর্ভে থাকা সন্তানের দাম ৩৭,০০০ টাকা! ভালোবাসা, রক্তের, আত্মার টানের দাম ৩৭,০০০ টাকা! হৃদয় কাঁপে না?
ভাবতে পারছেন? বা কল্পনা? আমাদের বাড়িতে নবজাতকের আগমন নিয়ে মাসের পর মাস পরিকল্পনা হয়। মুখ দেখে সোনার আংটি দিবো না-কি গলার চেইন; এই নিয়ে কত কনফিউশান! কে কোন নামে ডাকবে, সেসব ভেবে রাতে ঘুম হয় না!
ঘুম আব্দুর রশিদ বা রোকেয়ারও হয় না। তবে ওদের এসব নির্ঘুম রাত রোমাঞ্চকর নয়; ভয়ানক বটে! সন্তান বিক্রি করেও রশিদের বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা, অপরাধবোধ, অসহায়ত্ব, হতাশা বোধহয় কুড়ে কুড়ে খায় ওদের। কিন্তু ৩ বেলা ঠিকঠাক খাবার খাওয়া হয় কি-না সে খবর আমার জানা নেই।
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে রশিদের ভিডিওচিত্র দেখছিলাম। পাঁজরে ক'খানা হাড় গুণতে পারবেন ঠিক! একটিও কম-বেশি হবে না! ২৯ বছরের যুবককে দেখে মনে হবে অশীতিপর বৃদ্ধ। চোখগুলো অপলক। বোধহয়, অদৃশ্য কিন্তু নিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে চোখ জোড়া!
আমার বয়সী এক নারীর প্রসবের তিনদিনের মাথায়, নিজের ভেতরে তিলতিল করে বেড়ে ওঠা সন্তানকে বিক্রি করে দিতে কেমন লেগেছিলো ভেবে দু'চোখের পাতা এক করতে পারি না৷ এর দায় কার? উত্তর পাই না। অসহায় লাগে। ভাবতে থাকি, কী করতে পারি ওদের জন্য?
৫ আগস্ট স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ; দারিদ্রতা থেকে আমাদের মুক্তি মেলে না কেবল!
এসব ভাবতে ভাবতে দেখি পকেটে টাকা কমজোর, চোখে পানি!
No comments
ধন্যবাদ।