শনিবার গুজবের রাত
চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে ঘোষিত সরকারের পদত্যাগের দাবিকে ঘিরে গত শনিবারের রাতটি ছিল গুজবের রাত। শুরু থেকেই উত্তপ্ত করা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিভিন্ন ধরনের ভুয়া ছবি, ফটোকার্ড ও ভিডিও কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফলে গুজবে সয়লাব হয়ে যায় ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সব প্ল্যাটফর্ম। যা খালি চোখে দেখার উপায় নেই-কোনটা আসল আর কোনটা নকল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়িয়েছে গত শনিবার (৩ আগস্ট) রাতে। এ রাতে ১৯টি গুজব শনাক্ত করেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘রিউমার স্ক্যানার’। এর মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ৯টি ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ১০টি গুজব শনাক্ত করে তারা। তাদের দাবি, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে এসব গুজব ছড়ানো হয়েছে। যা দেখে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে এগুলো আবার শেয়ারও করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে গত শনিবার বিকালে জাতীয় শহিদ মিনার থেকে এক দফা আন্দোলনের ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। অন্যদিকে আন্দোলন প্রতিহতের কর্মসূচি দেয় আওয়ামী লীগ। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি এমন কর্মসূচির কারণে সবার নজর ছিল ফেসবুকে। উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ছিল টানটান উত্তেজনা। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যায়-এমন কোনো পোস্ট দেখলেই বাছ বিচার ছাড়াই তা অবাধে শেয়ার করা হয়েছে ফেসবুকে। ফলে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে গুজবের ডালপালা।
শনিবার গভীর রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটি গুজব সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো রাতে শহিদ মিনারে আন্দোলনকারীদের গণজমায়েত ও দখলের ছবি। অন্যটি কোটা আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলমের বাসায় র্যাবের অভিযানে ২ কোটি টাকা উদ্ধার। কেউ কেউ টাকা ভর্তি একটি ব্যাগের ছবি দিয়ে লিখেছে ‘তা হলে এইবার বুঝো তোমরা কাদের জন্য আন্দোলন করেছো’।
আবার কেউ কেউ লিখেছে ‘রাত পেরোনোর আগেই ঢাকা ছেড়ে পালিয়েছে তিন সমন্বয়ক’ এ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে ফটোকার্ড বানিয়ে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কার্ডে লেখা হয়েছে ‘কোটা সংস্কারের পক্ষে ছিলাম এখন যেটা চাচ্ছেন সেটার পক্ষে নেই’। এমন লেখা একটি কার্ড শেয়ার করে বেসরকারি একটি টেলিভিশনের সংবাদ পাঠক তার ফেসবুকে লিখেছেন ‘গুজবের একটা লিমিটেশন থাকা উচিত’ ‘বিভ্রান্ত হবেন না, আমার মতিভ্রম হয়নি এমন কিছু লেখার প্রশ্নই উঠে না’।
ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘রিউমার স্ক্যানার’ বলছে, গত শনিবার রাতে ছড়ানো অন্তত ১৯টি গুজব শনাক্ত করেছে তারা। এর মধ্যে ৯টি গুজব সরকারের বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়েছে। আর ১০টি গুজব কোটা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সারজিসের বাসা থেকে ২ কোটি টাকা উদ্ধার দাবিতে যমুনা ও কালবেলার নামে ভুয়া ফটোকার্ড, আওয়ামী লীগের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভুয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাতেই ছাত্রলীগের দখলের দাবিতে পুরোনো ভিডিও প্রচার, কালবেলার নামে ভুয়া ফটোকার্ডে ওবায়দুল কাদেরের দেশ ছাড়ার গুজব, কালবেলার নামে ভুয়া ফটোকার্ডে তিন সমন্বয়কের ঢাকা ছাড়ার গুজব।
রিউমার স্ক্যানারের হেড অব অপারেশন্স সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, দেশের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটে গুজবের ভয়াবহ বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। চলমান আন্দোলনকে ঘিরে ইন্টারনেটে সরকার পক্ষ এবং সরকারবিরোধী পক্ষের মধ্যে প্রোপাগান্ডা ও পাল্টা প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব মোকাবিলায় ফ্যাক্ট চেকারদেরও রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। গুজবের ছড়ানোর ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভুয়া সূত্র ও নকল ফটোকার্ড প্রচারের বিষয়টি বেশি লক্ষণীয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, গুজব আন্দোলনকে আরও উসকে দিচ্ছে, ফলে দেশে সংঘাত বাড়ছে, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এ ধরনের গুজব সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, যা রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই যেকোনো খবর যাচাই-বাছাই না করে শেয়ার না করার পরামর্শও দেন তিনি।
সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান যোহা সময়ের আলোকে বলেন, কোটা আন্দোলনের প্রথম গুজব ছড়ানো হয় শুরুর দিকে ছয়জনের মৃত্যুর খবরের মধ্য দিয়ে। সেই ছয়জনের গুজবের ওপর ভর করে এখন তিন থেকে চারশ মানুষের মৃত্যু হলো। মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলো যখন রাষ্ট্রীয় চাপে সঠিক খবর প্রকাশ করতে চায় না তখন জনগণ সিটিজেন জার্নালিজমের আলোকে একেকটা মিডিয়া হয়ে যায়। কারণ যত বেশি গুজব, তত বেশি ভাইরাল।
গুজব প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চেয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
No comments
ধন্যবাদ।