Header Ads

Header ADS

জুলাই স্মরণে

 "এই মুগ্ধ, সাতসকালে কোথায় যাচ্ছিস?"

স্নিগ্ধের ঘুম জড়ানো কন্ঠ শুনে চমকে উঠলো মুগ্ধ। ভাইয়ের ঘুম ভেঙেছে দেখে অবাকও হলো। কাল সারারাত কাজ করেছে স্নিগ্ধ। সেই হিসেবে তিনটা চারটা পর্যন্ত ঘুমানোর কথা ওর। মুগ্ধ কি ভেবে একটু হেসে স্নিগ্ধের পাশে এসে বসলো। স্নিগ্ধ ততক্ষণে উঠে বসেছে। মুগ্ধ বললো-"প্রথম কথা হলো এখন মোটেও সাতসকাল না ব্রো। দুপুর দেড়টা বাজে। ভাবছি আজ আন্দোলনে যাব। শুনলাম খুব গন্ডোগোল হচ্ছে কি পরিস্থিতি একটু দেখে আসি।"


স্নিগ্ধ মুখে হাত ঠেকিয়ে হামি আঁটকে জানতে চাইলো-"কোথায় হচ্ছে কিছু জানিস?"

"উত্তরা বাড্ডা সব জায়গার কথাই তো শুনছি। বাদ দে। তুই কি আরও ঘুমাবি নাকি উঠবি? আমি নুডলস বানিয়েছিলাম। তোরটা টেবিলে রাখা আছে।"

স্নিগ্ধ ঘুম ঘুম চোখে ভাইকে দেখলো খানিকক্ষণ। তার মন চাইছে আরও কিছুক্ষণ ঘুমাতে কিন্তু মুগ্ধর কথা ভেবে চোখ কচলে জানতে চাইলো-"তুই কখন উঠলি?"

"সাড়ে এগারোটায় উঠেছিলাম বাইরে যাব বলে। পরে আর যাওয়া হলো না। ভাবলাম বসে থেকে কি করবো তাই নুডলস বানিয়ে খেয়ে ফেললাম।"

"তো এখন কেন যাচ্ছিস? গন্ডগোলে বের না হওয়ায়ই তো ভালো। আম্মু শুনলে টেনশন করবে।"

"আম্মুকে বলিস না প্লিজ। তাছাড়া আমি তো মারামারি করতে যাচ্ছি না। মানুষকে হেল্প করতে যাচ্ছি। হেল্প করা হলে চলে আসবো।"

রাত জেগে কাজ করার ফলে এখনো চোখে ঘুম লেগে আছে স্নিগ্ধর। সে কিছুটা শঙ্কা নিয়ে ভাইকে বললো-"যাস না মুগ্ধ। পুলিশের আচরণ তো দেখেছিস কাল। কখন কি হয় বলা যায় না।"

মুগ্ধ মুগ্ধতা নিয়ে ভাইকে দেখলো। শান্ত চাহুনি দিয়ে ভাইকে আশ্বস্ত করে বললো-"আরেহ, আমি বললাম তো মিছিল মিটিং করবো না। ছাত্রদের কোনভাবে হেল্প করা গেলে করবো। ধর খাবার পানি এসব দিলাম আর কি। আর এতো ভয় পাচ্ছিস কেন? সবাই যদি ভয় পেয়ে বাসায় বসে থাকে তাহলে আন্দোলন করবে কারা?"

"যে করে করুক তোর এতো ভাবার দরকার নেই।"

"কি সেলফিশের মতো কথা স্নিগ্ধ? সরকারি ইউনিতে পড়েছি, স্কাউটের সাথে যুক্ত আছি, অসহায় অবস্থায় বসে থেকেছি কখনো? একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের একটা দায়িত্ব আছে না? বাবা মা কি বলেছে মনে নেই?"

মুগ্ধ কাঁধে ব্যাগ তুলে নিতেই স্নিগ্ধ মরিয়া হয়ে বাঁধা দিলো-"এতো কিছু বুঝি না আমি। তুই যাবি না মানে যাবি না।"

মুগ্ধ হেসে দিলো। স্নিগ্ধ মুহূর্তের জন্য থমকায়, ভাইয়ের হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে কেন যেন মনটা খচখচ করে উঠলো। 

"কি দেখছিস?"

স্নিগ্ধ মনের শঙ্কা একপাশে রেখে বললো-"মুগ্ধ, তুই কি জানিস তোর হাসিটা কত সুন্দর? তোর হাসি মুখ দেখেছি মানে আজ আমার দিন ভালো যাবে দেখিস।"

মুগ্ধ দরজা থেকে ফিরে এসে আচমকা ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো-"এই যে একটা হাগ দিয়ে দিলাম। এবার তোর দিন আরও ভালো যাবে যা। হাতের কাজটা আজকে শেষ করতে পারবি। রাতে এসে আমি হেল্প করবো।"

স্নিগ্ধ হাসলো। যেন তেন হাসি নয় একেবারে প্রান খোলা হাসি যাকে বলে। মুগ্ধ বিদায় নিলো-"গেলাম। রাতে দেখা হবে। সাবধানে থাকিস।"

***

"সৈকত, কোথায় আছিস? আমি বের হচ্ছি তুইও আয় তাড়াতাড়ি। সাম্য ফোন দিয়ে বললো বাড্ডা উত্তরার ওদিকটায় খুব খারাপ অবস্থা।"

"আচ্ছা, আমি বের হচ্ছি।" সৈকত জবার দিলো। মুগ্ধ বললো-"শোন আমি পানি আর বিস্কুট কিনে নিয়েছি। তুই পারলে একটু দেখ তো কোন জুস পাশ কিনা। পেলে আনিস এক ক্যারেট।"

"ঠিক আছে। আমি উত্তরায় ক্রিশেন্টের গলিতে থাকবো তুই তাড়াতাড়ি আয়।"

মুগ্ধ ফোন কেটে দ্রুত রিকশায় উঠলো। রিকশায়  যেতে  যেতে ঘেমে নেয়ে উঠলো মুগ্ধ। আজ গরমটা একটু বেশি মনে হচ্ছে। এরমধ্যে সৈকতে ফোন এলো। মুগ্ধ ফোন ধরলে সৈকত চেচিয়ে উঠলো-"আমি চার নাম্বার রোডের মাথায় আছি। তুই এখানেই আয়। আজমপুর বাসস্ট্যান্ডে খুব গন্ডগোল হচ্ছে। ওদিকে যাওয়া ঠিক হবে না এখন।"

"আচ্ছা, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।"

ফোন কাঁটার পাঁচ মিনিট পরেই মুগ্ধকে দেখা গেলো। এক ক্যারেট পানি বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে নেমে এলো সে। সাম্যর কাছে আছে জুসের ক্যারেট। তিনবন্ধু মিলে প্ল্যান করলো কোত্থেকে দেওয়া শুরু করবে। মুগ্ধ বললো-"রবীন্দ্র সরনীতে অনেক জটলা দেখছি। ওখানে যাই চল।"

সাম্য বাঁধা দিলো-"ওপাশে খুব ঝামেলা চলছে। তারচেয়ে আমরা বাম দিক দিয়ে যাই। যাকে যাকে দিতে পারলাম দিলাম।"

মুগ্ধ মেনে নিলো-"আচ্ছা চল যাই।"

তিন বন্ধু জিনিস হাতে তুলে নিয়ে হাঁটা দিলো। মেইন রোডের কাছাকাছি এসে হাঁক দিয়ে পানি দিতে শুরু করলো মুগ্ধ-"এই কারো পানি লাগবে ভাই, পানি।"

বলতে বলতে পানির ক্যারেট বাড়িয়ে ধরছে। যার যার প্রয়োজন মতো পানি নিয়ে নিচ্ছে। সাম্য আর সৈকত মুগ্ধর দেখাদেখি এক প্যাকেট করে বিস্কুট আর জুস দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনজন ঘেমে নেয়ে একাকার হলো। এরমধ্যে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লোকজনের ছোটাছুটি তো আছেই। সাম্য বললো-"এই মুগ্ধ আর পারছি না রে। অনেক গরম আজ। চল ভেতরের দিকে যেয়ে কিছুক্ষণ বসে রেস্ট নেই।"

মুগ্ধ নিজেও গরমে কাহিল। সে তাড়াতাড়ি মাথা দুলিয়ে সায় দিলো-"চল। খুব পানির পিপাসা পেয়েছে আমার।"

আইল্যান্ডের উপর বসে এক বোতল পানি খেলো মুগ্ধ। ঘামে জবজবে মুখটা হাতের গেঞ্জিতে মুছলো। আশপাশ তাকিয়ে দেখলো। মাঝে মাঝেই টিয়ারশেল, হ্যান্ড গ্রেনেড আর গুলির শব্দে চারপাশ কম্পিত হচ্ছে। 

সৈকত বললো-"পরিস্থিতি খুব খারাপ হচ্ছে মুগ্ধ। আমাদের মনেহয় বাসায় ফিরে যাওয়া দরকার।"

"হ্যা আমিও তাই ভেবেছি।হাতের জিনিস শেষ হলে চলে যাব। চল তাড়াতাড়ি দেওয়া শেষ করি।" 

সাম্য আর সৈকত তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ালো। হাতের জিনিসগুলো মানুষের হাতে দিতে দিতে এগুচ্ছে। ওদের হুট করে মনে হলো মুগ্ধর গলা পাওয়া যাচ্ছে না। দু'জনই একসাথে পেছনে ফিরলো। যা দেখলো তা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলো না দু'জনার কেউই। মুগ্ধ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, ওর সুন্দর চোখ দুটো ওদের দিকে নিবন্ধিত। দুই বন্ধু একসাথে চেচিয়ে উঠলো-"মুগ্ধ!"

***

স্নিগ্ধর মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে আছে। মুগ্ধ যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে এই অস্থিরতা। বুকের মধ্যে ভীষণ হাসফাস লাগছে। কম্পিউটার খুলে কাজ করতে বসলেও বেশিক্ষণ পারলোনা বসে থাকতে। একমধ্যে মায়ের ফোন-"স্নিগ্ধ, খেয়েছিস আব্বা?"

নিজেকে স্বাভাবিক রেখে স্নিগ্ধ জবাব দিলো-"খেয়েছি মা।"

"মুগ্ধ কই? ওকে ফোন দিলাম ধরলো না।"

মায়ের প্রশ্ন শুনে স্নিগ্ধর হাত পা কাঁপে। ফ্যানের নিচে বসে থেকে ঘেমে একাকার হয়। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো-"ও একটু নিচে গেছে মা।"

"আচ্ছা এলে আমাকে ফোন করতে বলিস।"

"ঠিক আছে মা।"

স্নিগ্ধ ফোন নামিয়ে রাখলো। আবার কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলোনা। নেটের স্পিড একদম কম। ঘামে শরীর ভিজে আসছে অকারণে। আচ্ছা, মুগ্ধ এখন কোথায় আছে? ও নিশ্চয়ই এরকম ঘামছে। তা নয়তো ওর এরকম লাগবে কেন? জমজ হওয়ার কারনে দু'জন অনেক কিছু একসাথে অনুভব করতে পারে। হাসি কান্না কষ্টগুলো দুজন ফিল করতে পারে। সেইজন্যই স্নিগ্ধর ভয় হচ্ছে। কম্পিউটারের সামনে বসে চোখ বুজলো স্নিগ্ধ। হঠাৎ তার মাথা তীব্র ঝাঁকি খেলো। সুক্ষ যন্ত্রণা টের পেলো মাথায়। দু'হাতে মাথা ধরে বসলো স্নিগ্ধ। ব্যাথার যন্ত্রণায় চোখ পানি ছেড়েছে আপনাতেই। সহ্য করতে না পেরে স্নিগ্ধ আপন মনেই চেচিয়ে উঠলো-"মুগ্ধ, তুই ঠিক আছিস? এমন কেন লাগছে আমার? মনে হচ্ছে তোর সাথে খুব খারাপ কিছু হচ্ছে।"

"আমি ঠিক আছি স্নিগ্ধ। শোন, তোকে একটা রিকোয়েস্ট করি। আমি তো থাকবো না, এখন থেকে মাকে একটু দেখে রাখিস স্নিগ্ধ। প্রতি রাতে ওষুধের কথাটা মনে করিয়ে দিস নয়তো খেতে ভুলে যায়। আর বাবার প্রেশার ডায়বেটিস চেক করবি রেগুলার। ভাইয়ার কাজগুলোতে হেল্প করবি। আর শোন মাকে আমার জন্য চিন্তা করতে নিষেধ করবি। আমি ভালো থাকবো।"

মুগ্ধের পরিস্কার কন্ঠ কানে আসতেই চমকে ওঠে স্নিগ্ধ। ভয় পেয়ে মুখ তুলতেই দেখলো মুগ্ধকে। ওপাশের দেয়ালো হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুগ্ধ অবাক গলায় বললো-"তুই কখন এলি? আর এসব কি বলছিস মুগ্ধ? তুই থাকবি না, ভালো থাকবি এসব কথার মানে কি? কোথায় যাচ্ছিস তুই?"

মুগ্ধ জবাব দিলো না। কেবল দাঁত বের করে তার চিরচেনা পরিচিত মনভোলানো হাসিটা হাসলো। মুগ্ধর হাসি দেখে স্নিগ্ধর হৃদয় কেঁপে উঠলো। খুব খারাপ কিছু হওয়ার অনুভূতি হচ্ছে। মৃদু স্বরে ফিসফিস করলো-"এই মুগ্ধ, কথা বলছিস না কেন? তুই কোথায় যাচ্ছিস বলবি না?"

"এতো কথা বলার সময় নেই স্নিগ্ধ। তোকে যে কথাগুলো বললাম সেসব মাথায় রাখিস। নিজের খেয়াল রাখিস। আমার সময় শেষ আমি যাচ্ছি।"

"মুগ্ধ, কথা শোন। যাসনা প্লিজ।"

স্নিগ্ধ চেচিয়ে উঠলো। মুগ্ধ শুনলো না ওর ডাক, বাতাসে মিলিয়ে গেলো যেন। ভীষন অস্থির লাগে স্নিগ্ধর। সে চঞ্চল নয়নে এদিক সেদিক তাকায়। মাথা কাজ করছে না তার। হার্ট এতো দ্রুত গতিতে ছুটছে যে শরীরটা ভেঙে আসছে। থাকতে না পেরে চোখ বুজে টেবিলে মাথা এলিয়ে দিলো স্নিগ্ধ। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠতেই অনেক কষ্টে ভীষণ ভার হয়ে থাকা মাথাটা তুললো। সৈকতের ফোন দেখে ভ্রু কুঁচকে গেলো। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সৈকত হড়বড়িয়ে বললো-"স্নিগ্ধ, মুগ্ধর মাথায় গুলি লেগেছে। তাড়াতাড়ি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে আয়।" 

বলেই হাউমাউ করে কান্না করছে সৈকত। স্নিগ্ধ হতবিহ্বল হয়ে শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেলো আপনাতেই। তার চারিদিকে অন্ধকার নেমে এলো। 'মুগ্ধরে' বলেই মাথা ঘুরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো স্নিগ্ধ। 

সমাপ্ত।

Farhana_Yesmin

No comments

ধন্যবাদ।

Powered by Blogger.