সাঁজোয়া থেকে গড়িয়ে পড়া শহীদ ইয়ামিনের দেহ
-------------------------------কাজী জহিরুল ইসলাম
ঝাঁঝাঁলো দুপুরে পুলিশের নীল
সাঁজোয়া যানের ছাদ থেকে গড়িয়ে পড়লো ইয়ামিন;
লাল জুলাইয়ের তরুণ বিপ্লবী
একটি প্রকাণ্ড হিমবাহের মতো ভেঙে পড়ে উষ্ণ সমতলে।
মুহূর্তেই ওর দেহ থেকে বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে পড়ে
রক্তাক্ত নতুন এক জুলাইয়ে,
যা ক্রমশ প্রলম্বিত হতে হতে গড়ায় ছত্রিশ তারিখ অবধি।
খয়েরি স্যুয়েটারের নিচে
ইয়ামিনের পরনেও ছিল নীল রঙের একটি জিন্স,
সেই নীল রচনা করেনি স্নিগ্ধ এক বর্ষার আকাশ
শিল্প-নগরীর দীর্ঘ রাজপথ জুড়ে;
ওর নীল জিন্স চোখের পলকে দ্রোহের ঝলকে
হয়ে ওঠে ক্ষেপা এক মহাসমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ,
বেপথু খড়কুটোর মতো তুচ্ছ করে তোলে,
সহসা ভাসিয়ে নেয় ঘাতকের নীল এপিসিগুলো...
তখনও স্পন্দন ছিল,
আব্বার শুভ্র পাঞ্জাবীর মতো স্নিগ্ধ এক স্বদেশের স্বপ্ন
কেঁপে কেঁপে উঠছিল ওর গ্রীবার বাঁ দিকে;
ঘাতকেরা এই স্পন্দনতরঙ্গে এতোটাই ভীত হয়ে পড়ে যে
ইয়ামিনের দেহকে
সম্পূর্ণ নিথর করে দেবার উল্লাসে মেতে ওঠে পুনরায়,
বিপ্লবের আগুন দৃষ্টির আড়াল করার জন্যে
ওরা এক উদ্দীপ্ত তরুণ সৈনিকের মুমূর্ষু দেহকে সাভারের রাস্তায় টেনে-হিঁচড়ে
ছুঁড়ে ফেলে দেয় কংক্রিট-ডিভাইডারের অন্য পাশে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তপ্ত ছাত্রাবাসগুলো
বন্ধ করে দেয় স্বৈরাচারের দোসর নপুংসক কর্তৃপক্ষ;
নিরাপদে বাড়ি ফিরেও স্বস্তি নেই তরুণ ইয়ামিনের,
বন্ধুরা ফিরতে পেরেছে তো?
অস্থির ইয়ামিন,
বাবা ওকে ফেরাতে পারে না, বন্ধুদের বাঁচাতে হবে,
এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে,
ডাকতে হবে অন্য বন্ধুদেরও,
ভেঙে দিতে হবে স্বৈরাচারের তখতে-তাউস;
শত বিপ্লবীর দুঃসাহসী মায়েদের একজন ইয়ামিনের সামনে এসে দাঁড়ান,
কৈশোরোত্তীর্ণ পুত্রের বুকে দোয়া ইউনূস পড়ে নির্ভরতার ফুঁ দিয়ে বলেন,
যাও সোনা, বাংলাদেশ আজ তোমার প্রতীক্ষায়, তুমি যাও...
মমতার বুক থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন
আন্দোলনের উত্তপ্ত রাজপথে,
দেশ মাতৃকার সুবৃহৎ কোল উজ্জ্বল করে জ্বলে ওঠে ওরা;
ঘাতকের গুলি বোঝে না স্বদেশ,
বোঝে না মায়ের মমতা, পিতার অশ্রুসিক্ত শব্দাবলী,
শুধু রক্ত বোঝে, বোঝে লাশ আর অবৈধ ক্ষমতা।
হাসিনার রক্তলোলুপ ঘাতক বুলেট ঝাঁঝরা করে দেয়
এক সম্ভাব্য প্রকৌশলীর দেহ;
ভেঙে পড়া,
নষ্ট হয়ে যাওয়া রাষ্ট্র মেরামতের প্রতিশ্রুতি বুকে নিয়ে
ভর্তি হয়েছিল যে তরুণ এমআইএসটির উজ্জ্বল ক্যাম্পাসে,
চকিতে লুটিয়ে পড়ে সে রক্তাক্ত জুলাইয়ের সমস্ত অবয়ব জুড়ে;
চতুর্দিক প্রকম্পিত করে তখন সহস্র কন্ঠে উচ্চারিত হয়
এক গগনবিদারী স্লোগান...
"বুকের ভেতর দারুণ ঝড়
বুক পেতেছি গুলি কর।"
No comments
ধন্যবাদ।