আমার দাদি ও কিছু আত্মকথা
‘’দাদাভাই ! কই তুই ? শুনে যা ‘’ আমার দাদির এই মধু মাখা ডাকটাই আমার মন টা ভরিয়ে দেয় । আসলে দাদা দাদির আদর পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। আমি এদিক দিয়ে ৫০-৫০ । কারন আমার জন্মের আগেই আমার দাদা মারা গেছেন। দাদা কেমন মানুষ ছিলেন তা বাবা, চাচা , ফুফু এবং আশপাশের মানুষের কাছ থেকে জেনে বড় হয়েছি। তার ছবি দেখতাম আর তার সম্পর্কে জানা কথা গুলো ভেবে কল্পনার জগতে বিচরণ করতাম হয়ত দাদা এভাবে এরকম করতেন। ছোট থেকেই আমি দাদির আদরের মানুষ। কারন তার বড় ছেলের ঘরে নাতি একটাই। বাকিরা সবাই নাতনি। এই জন্যই হয়ত দাদির আদরের ভাগ আমার পক্ষেই বেশি পরত। আর আমাকে দেখে আমার বোনেরা ঈর্ষান্বিত থাকতো। কোন খাবার রাঁধলে, কোন কিছু কিনে আনলে বা কোথাও বেড়াতে গেলে বরাবর সাথী আমিই থাকতাম। সারাদিন অন্তত একবার আমাকে না দেখলে অস্থির হয়ে যেতেন ।
আমি ছোট থেকে দুরন্ত । এলাকা চষে বেরাতাম। সারাদিন ক্রিকেট, ফুটবল সহ বিভিন্ন খেলা খেলতাম। যদিও শহরে বড় হওয়া মানুষ তবে গ্রামের থেকে কম হলেও মজাটা কম করতাম না । সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়িয়ে গেলেও যখন বাড়ি ফিরতাম না , মা বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সাদরে স্বাগতম জানানর জন্য না । আমার শরীর মেসাজ করার জন্য। অবশ্য মেসাজ টা হত কখনো হাতের চড় থাপ্পরে নয়ত লাঠি দিয়ে। তবে এসব থেকে আমাকে বরাবর বাঁচাতেন আমার দাদি। তার কথা ছিল এই বয়সে আনন্দ করে বেরাবে না তো কখন করবে । ছেলেদের ধরে বেঁধে মানুষ করা যায় না । মার থেকে বাচঁতে দাদির পিছনে লুকাতাম। তারপরও মা’র মেসাজ টা কমত না । আমার জন্য দাদি অনেক সহ্য করেছেন। থাক সবারই এরকম কম বেশি জানা। আর না-ই বা বললাম। একদিন খেলতে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে আসলাম । সময়টা ছিল রোজার মাস ।
রোজা হোক বা অন্য কোন সময় , খেলা বন্ধ থাকতো না । এইজন্য আবার আমাদের এলাকার ছেলেদের সময় অনুযায়ী খেলার ছক থাকতো। যাকে আমরা মৌসুমি খেলা নামেও আখ্যায়িত করতাম। যখন বাসায় ফিরলাম টপটপ করে রক্ত ঝরতে দেখে মা উলটো বকা শুরু করলেন। হয়ত নিজের কষ্ট ওভাবে প্রকাশ না করে রাগ দিয়েই প্রকাশ করলেন । কারন যে ভালবাসতে পারে সে তিরস্কার ও করতে পারে। অবশ্য সেদিন কিছু বলিনি। দাদি বললেন, আগে কাপড় বেঁধে রক্ত পড়াটা বন্ধ কর। ইফতারি শেষে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাস। প্রতি ঈদে সবার কাছ থেকে সালামি নিলেও দাদির ভাগটা আমার আলাদা ছিল। অবশ্য তিনি নিজের কাছে টাকা না থাকলে বাবার কাছ থেকে নয়ত চাচাদের কাছ থেকে টাকা রেখে দিত। তারপর সেটাই আমাকে সালামি দিত। বাবার কাছ থেকে কখনো সালামি চাই নি , নেই ও নি ।
বাসায় আত্মীয় আসলে বা কোথাও বেড়াতে গেলে আমি দাদির সাথে থাকতাম। দাদির মুখে ‘আমার নাতি এরকম, আমার নাতি এই করেছে কথা গুলো শুনলে অনেক ভাল লাগত। অবশ্য সবারই একি রকম অনুভুতি লাগারই কথা। ছেলে হোক বা মেয়ে হোক দাদা দাদির মুখে এরকম কথা শুনলে সবার অন্য রকম অনুভুতি লাগে। স্কুল থেকে ফেরার পর দেখতাম দাদি আমাদের ঘরে বসে থাকতেন। আমাকে ইউনিফর্ম সহ স্কুল থেকে ফিরছি এরকম দেখার জন্য। পড়ালেখার প্রতি তাগিদ বরাবর ছিল। কিছুদিন যেতে দেখলাম দাদি আগের মত তেমন উচ্ছল নেই। প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। শুয়ে বসে থাকেন। আমাদের ঘরেও তেমন কম আসতেন । মনটা প্রায় এইজন্য খারাপ থাকতো। দাদির ঘরে গিয়ে বসে থাকতাম। গল্প করে ,হাসিয়ে দাদির মন টা ভাল রাখার চেষ্টা করতাম। ডাক্তার দেখালে তিনি বললেন দাদির হাঁটুর হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে। তাই তিনি আগের মত বেশি চলাচল করতে পারবেন না । তাছাড়া ডায়াবেটিস সহ অন্যান্যরোগ ও রয়েছে। দাদির প্রায় সমবয়সী এক মহিলা আমাদের সাথেই থাকতেন। তাকে কখনো দাদি নামে ডাকা হয়নি। তাকে তার বড় ছেলের নামের সাথে ডাকা হত ফজলের-মা নামে।
ছোট থেকে শুনে এসেছি তাই আমি আর আমার বোনরাও ওই একি নামেই ডাকতাম। অবশ্য তিনি রাগ করতেননা । তিনিও আমাদের অনেক আদর করতেন। তিনি দাদির সেবা শুশ্রূষা করতেন। দাদির ওষুধ গুলো খুচরাভাবে আমি কিনতাম প্রায়ই। তাই ওষুধগুলোর নাম আমার জানা হয়ে গিয়েছিল। ওষুধ কেনার জন্য দাদি ডাক দিলে শুধু টাকা টা নিতাম। আর ওষুধ কিনে আনতাম। দাদি জানতেন আমার ওষুধের নাম জানা আছে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে বাসায় এসে খেতে বসে খেলা দেখছিলাম। দাদি ফজলের-মা’কে দিয়ে পাঠালেন আমাকে বাজারে যাবার জন্য। রাগ দেখিয়ে মানা করে দিয়েছিলাম। অবশ্য দাদি রাগ হয়েছিলেন নাকি আজ ও জানা নেই। শেষ দিকে দাদি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হসপিটালে নিতে হয়েছে কয়েকবার। তিনি শুধু বাসায় থাকতে চাইতেন। আমাকে দেখতে চাইতেন। আমার অন্যান্য বোনদের দেখতে চাইতেন। উনার বোনদের সাথে উনার মা’র সাথে দেখা করতে চাইতেন।। গল্প করতে চাইতেন। মজার ব্যাপার হল আমার দাদির মা , মানে আমার বড় আম্মা এখনও বেঁচে আছেন। যাই হোক , দাদির কথার জোরেই তাকে বাসায় নিয়ে আসতে বাধ্য হন বাবা আর চাচারা। তবে কিছুদিন যেতে তিনি একদম বিছানায় পড়ে গেলেন। মা , চাচি আর ফজলের-মা মিলে দাদির সেবা করতেন। কষ্ট হত দাদির এরকম অবস্থা দেখে। খেলা কমিয়ে দিয়েছিলাম।
দুরন্তপনাও কমে যেতে লাগলো। পড়ালেখা করতাম, কিছুক্ষণ খেলতাম বাকি সময় দাদির পাশে থাকতাম। তখনও দাদি আমার জন্য ফল, খাবার রেখে দিতেন। হঠাৎ করেই পক্সে আক্রান্ত হলাম। ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ। অন্য রুমেও যেতে দেয়া হতোনা, বাকিদের ও তেমন আমার রুমে আসতে দেয়া হত না পাছে অন্য কারো হয়ে যায়। এতে কষ্ট পেতাম না । কষ্ট পেতাম শুধু দাদিকে দেখতে না পাওয়ার কারনে। বাবা আমার সাথে ঘুমাতেন। কিছু লাগলে মা’কে ডাক দিতেন । পক্সের ৭ম দিন । সকালে মা’র আচমকা ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বুঝতে পারিনি কি হয়েছে। দেখি বাবা উঠেই সোজা দাদির ঘরে গেল, চাচারাও অদিকে । কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই মা কাঁদোস্বরে বললেন দাদি আর নেই । বিশ্বাস হয়নি। মানা থাকা সত্ত্বেও দৌড়ে গেলাম দাদির রুমে। ছোট চাচা বাইরে বসে কাঁদছেন। রুমে বাবা আর মেজ চাচা । তাদের চোখেও পানি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম দাদির মুখের দিকে। আর সহ্য করতে পারিনি। হয়ত সেদিন থেকেই আমার নিরবতা , অবচেতন মনের পাগলামি শুরু । সারাদিন অনেক মানুষ এসেছেন। আমার খোঁজ নিয়েছেন, দাদিকে শেষ দেখা দেখেছেন। সকলেই আমার ব্যবহারে আশ্চর্য।
আমার স্বাভাবিক আর অন্য সময়ের মত হাশি ঠাট্টা করছি। আমাকে অনেকেই সান্তনা দিয়েছেন। আমি হেসেছি শুধু। শেষ বারের মত আমাকে ডাকা হয়েছিল দাদিকে দেখতে। কান্না আটকাতে পারিনি। আমার কান্না দেখে বোনরাও কেঁদে দিয়েছিল। দাদিকে জড়িয়ে কাঁদতে চেয়েছিলাম। দেয়া হয়নি। এরপরের ঘটনা গুলো আরও করুন। না পেরেছি জানাজায় অংশ নিতে, না পেরেছি কবরে মাটি দিতে। আজ পর্যন্ত আমি দাদির কবরে যাইনি। নিয়ে যাওয়া হয়নি। দেখতে দেয়া হয়নি। কারন একটাই দাদির - মৃত্যু পরবর্তী আমার আচরণ ।আমি অতি কষ্টে আবার মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরি কিনা ! এর প্রায় ২-২.৫ বছর পর ফজলের-মা ও মারা গেলেন। কি পরিমান কষ্ট আমার মধ্যে আমি নিজেই জানি। কাউকে বলিনি। কষ্ট পুষে রেখেছি । বোর্ড পরীক্ষাগুলোয় ভাল ফলাফলের পর ফুফুদের মুখে ১ টাই কথা শুনেছি তোমার দাদাদাদি তোমার এই ফলাফল দেখে অবশ্যই খুশি হবেন , দূর থেকে দোয়া করবেন। চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনা। তখন বুঝতে পারিনি কতটা ভালবাসা আমার প্রতি তার ছিল। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না দেয়ার মত কাজ করেছি হয়ত অনেক। আজ বুঝতে পারছি আমার কাছে কতটা মূল্যবান ছিলেন তিনি। আজ বুঝতে পারছি কত টা ভালবাসা রয়েছে তার প্রতি আমার । ৫ টা বছর হতে চলেছে দাদি মারা গেছেন। হয়ত এবারো প্রতি বছরের মত দাদির ঘরের কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকব। নিরবতা পালন করব। স্মৃতি চারণ করব ।আমার মধ্যে আজ সেই দুরন্তপনা নেই, উচ্ছলতা নেই। মানুষের সাথে মেলামেশা কমে গেছে। একা পথ চলি। নিরব থাকি। আমার নিরবতার হয়ত অনেকগুলোর মধ্যে এটি ১ টি কারন। কেউ কেউ বলে আমি ভাব নেয়া মানুষ , ভাল ফলাফল করি দেখে ভাব নেই। আমি জানি কেন আমি কথা কম বলি। আমার মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ নেই। ভাব নেয়া মানুষ আমি না ।
আমার সরব থাকার কারনটাই যে আজ নেই। তবুও চেষ্টা করি কষ্টটা নিছে লুকিয়ে রেখে হাসির আবরন টা মুখে রাখতে। পুরনো দিনের সোনালি অতীত আজ বার বার মনে পড়ছে। সেই হাসি ঠাট্টা সাথে কিছুটা বাদঁরামি , আসলেই চমৎকার সময় ছিল। কথার প্যাঁচ আর লুকোচুরিতে অনেকটা যে সময় চলে গেছে টের পাইনি। কষ্ট ভুলে থাকতে নিজের সাথেই অনেক লুকোচুরি খেলেছি অনেক সময় ধরে। আজ সময়ের প্রাতে ভাল থাকা না থাকা মুখ্য বিষয় না । মুখ্য হলো কে কোথায় হারিয়ে গেছে। সময়টা যে নিষ্ঠুর টা হয়ত আগের থেকেই জানা কিন্তু উপলব্ধিটা তো মাত্র শুরু। বদলানোটা স্বাভাবিক না , বাধ্যতামুলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। না হলে যে লোকে ‘বড্ড এক ঘেঁয়ে’ আখ্যা দিবে। অবশ্য লোকের কথা কম শুনতে হচ্ছেনা। কি আর করব, গায়ে মাখতে না চাইলেও বৃষ্টির মত অনবরত উপরে কথা গুলো বর্ষণ হয় আর লেপে যায়। তখন তো হাজার ভাল থাকার চেষ্টা করলেও লোকে তাকে ভাল থাকতে দিবে না । ওই যে আমাদের মূল সমস্যা হল মানসিকতায় ।
হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর সাথে ফের দেখা করার ইচ্ছে জাগে , কথা বলার ইচ্ছে জাগে। অবান্তর চিন্তা ! তবুও এই অযৌক্তিক চিন্তা টায় যে মন বার বার সায় দেয় ! মায়া জাল এমন একটা বিষয় আটকে পড়লে নিজেকে ছাড়ানো অনেক কষ্টকর । আর পারলেও কিছুটা কাঁটা দাগের উপর আবছা লিখাটা দেখার মত মায়া টা থেকেই যায়। সময়টা বশে আনার শক্তি বিধাতা বাদে কারো নেই। তবুও আমরা বৃথা চেষ্টা করি, পাছে যদি কিছু করা যায় !
বড্ড ইচ্ছে জাগে পুরোনো দিনে ফিরে যেতে, পুরোনো স্মৃতি হাতরে বেড়াতে। সময় টা যদি আটকে রেখে পিছনে ফিরে যাওয়ার শক্তি পেতাম, শৈশবে ফিরে যেতাম, এই কৃত্রিমতা ঘেরা জীবন টাকে সামনে রেখেই। ফেরত আসতাম না । কখনই এই সময়টাকে আপন করে নিতাম না । কখনই না ।
No comments
ধন্যবাদ।