কী খাচ্ছেন মন্ত্রী-সচিবরা
ঢাকার সাভার গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার থেকে সপ্তাহে দুদিন মন্ত্রণালয়ে দুধ সরবরাহ করা হয়। অন্যান্য দিন উন্মুক্ত রাখা হয় সাধারণ মানুষের জন্য। এসব দুধ পাস্তুরিত না করেও প্যাকেটের গায়ে উল্লেখ করা হচ্ছে পাস্তুরিত দুধ। মূলত গত ছয় মাস ধরে গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের কর্মকর্তারা পাস্তুরিত দুধের নামে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া খাওয়াচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। এর মাধ্যমেই গত ছয় মাসে ডেইরি কর্মকর্তারা হাতিয়ে নিয়েছেন অন্তত ২৫ লাখ টাকা।
শুক্রবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতি লিটার পাস্তুরিত দুধের মূল্য ৭০ টাকা ও নন-পাস্তুরিত দুধের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ টাকা। অথচ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে ডেইরি কর্মকর্তারা নন-পাস্তুরিত দুধ পাস্তুরিত উল্লেখ করে প্যাকেটজাতের মাধ্যমে প্রতি লিটার দুধে ১০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করছেন। আর পাস্তুরিত দুধের নামে ব্যাকটেরিয়া খাওয়াচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের।
গবেষকরা বলছেন, পাস্তুরিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবাদিপশুর কাঁচা দুধ ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উষ্ণ করে আবার ৩০ সেকেন্ডের কম সময়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ঠান্ডা করে প্যাকেটজাত করতে হয়। ফলে দুধে থাকা ক্ষতিকর প্যাথোজেনসহ অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করা হয়।
সাভার কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের বায়ার অফিসার সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পর্যাপ্ত বাজেট না থাকার কারণে আমরা গ্যাস বিল পরিশোধ করতে পারিনি। যার ফলে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ডেইরি প্ল্যান্টের গ্যাস সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। গ্যাংসের সংযোগ না থাকার কারণে দুধ গত ছয় মাস বা কিছু কম সময় ধরে পাস্তুরাইজড করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এসব দুধ পাস্তুরিত প্রক্রিয়া ছাড়াই প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। পাস্তুরিত না করে দুধের প্যাকেটে পাস্তুরিত উল্লেখ করা হচ্ছে, এতে মন্ত্রী-সচিব ও জনগণকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে কিনা? জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন পরিচালক স্যার।
জেনেশুনে মন্ত্রী-সচিবদের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াযুক্ত দুধ খাওয়ানো হচ্ছে কিনা? জানতে চাইলে সাভার কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের পরিচালক ডা. মো. মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের কাছে বিকল্প কোনো উপায় ছিল না। তাই আমরা আগের পলিতেই (পাস্তুরিত উল্লেখকৃত প্যাকেট) ওই দুধ প্যাকেটজাত করে সচিবালয়ে পাঠাই। পাস্তুরিত না করেও দুধের মূল্য ১০ টাকা অতিরিক্ত আদায়ের কারণ ও এ কৌশলে ২৫ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়ে তিনি কোনো সঠিক উত্তর দিতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুগ্ধ খামারের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ২৪০টি দুধাল গাভী থেকে প্রতিদিন ১৪০০ লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়। এ হিসেবে গত ছয় মাসে ২ লাখ ৫২ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতি লিটারে পাস্তুরিতকরণের নামে অতিরিক্ত ১০ টাকা আদায় করা হলে ২ লাখ ৫২ হাজার লিটার দুধে ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্ল্যান্ট চালানোর সদিচ্ছা থাকলে তারা গ্যাস বিলের মাত্র ৩ লাখ বকেয়া টাকা এখান থেকেও পরিশোধ করে ডেইরি প্ল্যান্ট চালু করতে পারতেন। মূলত পাস্তুরিত প্রক্রিয়া বন্ধ থাকার কারণে ‘ডেইরি কর্মকর্তা’ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। যার ফলে তারা চাচ্ছে না পাস্তুরিত প্রক্রিয়া চালু হোক।
কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের ডেইরি অফিসার রেজওয়ানা আফরীন খান যুগান্তরকে বলেন, ডেইরি প্ল্যান্টের সব বিষয় পরিচালক স্যারের নির্দেশনার আলোকে বাস্তবায়ন করে থাকি। তাই টাকা আত্মসাতের দায় আমার ওপর চাপানো ঠিক হবে না। এ ছাড়া পাস্তুরিত ছাড়া দুধের মূল্য ৭০ টাকা আদায়ের পর সরকারি কোষাগারে লিটারে কত টাকা জমা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে বলা যাবে।
অথচ সপ্তাহে দুদিন দুধের মূল্য সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হলেও এসব তথ্য তার মনে নেই।
No comments
ধন্যবাদ।